বন্ধ দরজার ওপাশে ছিল সত্য

পনেরো বছরের মায়া তখনও জানত না, পৃথিবীর সব হাসি সত্যি হয় না।

তার ছোট্ট পৃথিবীটা ছিল খুব সাধারণ।

স্কুল, পড়াশোনা, মা-বাবা, কয়েকজন বান্ধবী—আর তার মধ্যে সবচেয়ে কাছের ছিল তৃষা।

তৃষার সঙ্গে মায়ার বন্ধুত্ব ছিল ছোটবেলা থেকেই।

দুজনের মধ্যে এমন কোনো কথা ছিল না, যা তারা একে অপরের কাছ থেকে লুকাত।

কিন্তু মায়ার জীবনে তখন নতুন একটা মানুষ এসেছিল।

অর্ণব।

কিশোর বয়সের আবেগে মায়া তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল।

অর্ণবও তাকে নানা মিষ্টি কথা বলত।

বলত,

—"তুই আমার ওপর চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারিস।"

মায়া সত্যিই বিশ্বাস করেছিল।

সে বুঝতে পারেনি, কিছু মানুষ বিশ্বাস পাওয়ার যোগ্য না হয়েও বিশ্বাস পাওয়ার অভিনয় করতে পারে।

একদিন বিকেলে তৃষা মায়াকে নিজের বাসায় ডাকল।

—"আজ তুই একটু তাড়াতাড়ি আয়। অনেক গল্প করব।"

মায়া হাসতে হাসতে বলেছিল,

—"ঠিক আছে।"

স্কুল শেষ করে সে তৃষাদের বাসায় চলে গেল।

বাড়িতে তখন খুব বেশি কেউ ছিল না।

তৃষা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

অর্ণবও সেখানে ছিল।

মায়া তাকে দেখে অবাক হলেও খুশিই হয়েছিল।

অর্ণব কাছে এসে বলল,

—"মায়া, তোর সঙ্গে একটু কথা আছে।"

—"কী কথা?"

—"চল, ভেতরে।"

মায়া কোনো সন্দেহ না করে তার পেছনে গেল।

ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

প্রথমে সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর অর্ণবের আচরণ বদলে গেল।

মায়া অস্বস্তি বোধ করল।

সে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে চাইল।

—"আমি বাইরে যাব।"

অর্ণব তাকে ভয় দেখিয়ে থামিয়ে দিল।

মায়া বুঝতে পারল, সে বিপদে পড়েছে।

তার বুকের ভেতর ধকধক করতে লাগল।

সে সাহায্যের জন্য ডাকতে চাইল।

কিন্তু অর্ণব নিচু গলায় বলল,

—"চিৎকার করিস না।"

মায়া কাঁপতে কাঁপতে বলল,

—"আমাকে যেতে দাও।"

অর্ণব তাকে আরও ভয় দেখাল।

—"তুই যদি চিৎকার করিস, সবাই সব জেনে যাবে। তখন তোরই বদনাম হবে।"

মায়া তখন মাত্র পনেরো বছরের একটা মেয়ে।

সে জানত না কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয়।

সে শুধু ভয় পেয়েছিল।

ভীষণ ভয়।

সেদিন তার সঙ্গে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যার জন্য মায়া কোনোভাবেই দায়ী ছিল না।

কিন্তু অর্ণব তার অপরাধের দায়টাও মায়ার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল।

মায়া কিছু বলতে পারেনি।

কাঁদতেও যেন ভয় লাগছিল।

সেদিন ঘর থেকে বের হওয়ার পর সে অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

তৃষা তাকে দেখে বলেছিল,

—"কী হয়েছে?"

মায়া কোনো উত্তর দেয়নি।

শুধু বলেছিল,

—"আমি বাড়ি যাব।"

তৃষা অবাক হয়েছিল।

—"এখনই?"

মায়া মাথা নাড়ল।

—"হ্যাঁ।"

তারপর সে চলে গেল।

সেদিনের পর মায়া বদলে গেল।

আগের মতো হাসত না।

কথা বলত না।

রাতে ঘুমাতে গেলে বারবার সেই বন্ধ দরজাটা মনে পড়ত।

কোনো পুরুষের গলার স্বর একটু কঠিন হলেই তার বুক ধড়ফড় করত।

কেউ হঠাৎ দরজা বন্ধ করলে সে চমকে উঠত।

কিন্তু কাউকে কিছু বলত না।

কারণ অর্ণব তাকে ভয় দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল—

"মানুষ জানলে তোরই সম্মান যাবে।"

পনেরো বছরের একটা মেয়ে তখনও জানত না—

লজ্জা তার নয়।

অপরাধ তার নয়।

দোষও তার নয়।

তবুও সে নিজের ভেতরেই নিজেকে দোষী ভাবতে শুরু করেছিল।

তৃষা কয়েকদিন পর মায়াকে ফোন করল।

—"তুই আমার সঙ্গে কথা বলছিস না কেন?"

মায়া ফোন কেটে দিল।

আবার ফোন এল।

সে ধরল না।

তৃষা বুঝতে পারছিল না, কী হয়েছে।

কিন্তু মায়ার মনে তখন একটা কথাই ছিল—

"তুই আমাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলি, যেখানে আমি নিরাপদ ছিলাম না।"

সে তৃষাকে ক্ষমা করতে পারেনি।

হয়তো তৃষা সব জানত না।

হয়তো জানত।

মায়া কোনো উত্তর খুঁজতে চায়নি।

সে শুধু দূরে সরে গেল।

কয়েক সপ্তাহ পর অর্ণবের কথাও আর শোনা গেল না।

তারপর একদিন খবর এল—

অর্ণব আরেকটা মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে গেছে।

মায়া খবরটা শুনে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।

মা জিজ্ঞেস করলেন,

—"কী হয়েছে?"

মায়া মাথা নাড়িয়ে বলল,

—"কিছু না।"

তারপর নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

বিছানায় বসে অনেকক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকল।

তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল।

কিন্তু সে শব্দ করে কাঁদছিল না।

সেদিন সে নিজের মনে একটা প্রতিজ্ঞা করেছিল—

কাউকে আর কখনো নিজের এতটা কাছে আসতে দেবে না।

বছর কেটে গেল।

মায়া বড় হলো।

পড়াশোনায় মন দিল।

নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম করল।

সে জানত, জীবনে কাউকে ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না।

নিজেকেই নিজের শক্তি হতে হবে।

অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে একটা নামী প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেল।

প্রথম দিন অফিসে ঢোকার সময় তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল।

নতুন জায়গা।

নতুন মানুষ।

নতুন জীবন।

সে জানত না, এই অফিসেই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির সঙ্গে পরিচয় হবে।

অফিসের সবাই একজন মানুষকে ভয় পেত।

আরিয়ান রহমান।

কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর।

লম্বা, সুদর্শন, ব্যক্তিত্বপূর্ণ।

সবসময় পরিপাটি পোশাক।

কথা কম।

কাজের ব্যাপারে প্রচণ্ড কঠোর।

তার সামনে কেউ ভুল করলে রেহাই পেত না।

কর্মচারীরা আড়ালে বলত,

—"স্যারের মেজাজের ঠিক নেই।"

—"একটু ভুল করলেই শেষ।"

—"তবে কাজ বোঝেন অনেক।"

মায়া এসব শুনে চুপ করে ছিল।

প্রথম দিনই তাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়ে আরিয়ানের কেবিনে যেতে হলো।

দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে গম্ভীর গলা এল,

—"Come in."

মায়া ভেতরে ঢুকল।

আরিয়ান ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলেই বলল,

—"ফাইলটা দিন।"

মায়া ফাইল এগিয়ে দিল।

আরিয়ান কয়েক পৃষ্ঠা দেখল।

তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল,

—"এই রিপোর্ট কে তৈরি করেছে?"

মায়ার গলা শুকিয়ে গেল।

—"আমি, স্যার।"

আরিয়ান এবার তার দিকে তাকাল।

তার চোখ দুটো অদ্ভুত কঠিন।

—"এখানে এই হিসাবটা ভুল।"

মায়া দ্রুত বলল,

—"দুঃখিত, স্যার। আমি ঠিক করে দিচ্ছি।"

—"দুঃখিত বললেই ভুল ঠিক হয়?"

মায়া চুপ করে গেল।

আরিয়ান ফাইলটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।

—"এক ঘণ্টার মধ্যে ঠিক করে আনবেন।"

—"জি, স্যার।"

মায়া ঘুরে বেরিয়ে আসতে গেল।

ঠিক তখন আরিয়ান বলল,

—"এক মিনিট।"

মায়া থেমে গেল।

আরিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—"আপনি কি সবসময় এত ভয় পান?"

মায়া চমকে উঠল।

—"জি?"

—"কিছু না। যান।"

মায়া বেরিয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার পর আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তার মনে হলো—

মেয়েটা তাকে ভয় পায়।

অস্বাভাবিকভাবে ভয় পায়।

কিন্তু কেন?

দিন যেতে লাগল।

মায়া কাজ ভালো করত।

তবুও আরিয়ান তাকে প্রায়ই কঠিন কাজ দিত।

কখনো রাত পর্যন্ত বসিয়ে রাখত।

কখনো রিপোর্ট দশবার সংশোধন করাত।

মায়ার মনে হতো, আরিয়ান যেন ইচ্ছে করেই তাকে বেশি কাজ দেয়।

একদিন সে সাহস করে বলেই ফেলল,

—"স্যার, আপনি আমাকে এত কাজ দেন কেন?"

আরিয়ান চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল,

—"কারণ আপনি পারেন।"

মায়া অবাক হয়ে গেল।

—"মানে?"

—"আপনি অন্যদের চেয়ে দ্রুত শিখছেন।"

মায়া কিছু বলতে পারল না।

আরিয়ান ফাইলের দিকে তাকিয়ে বলল,

—"আর একটা কথা।"

—"জি?"

—"নিজেকে যতটা দুর্বল ভাবেন, আপনি তার চেয়ে অনেক বেশি শক্ত।"

মায়া স্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

এই প্রথম কেউ তার সম্পর্কে এমন কথা বলেছে।

কেউ জানত না তার ভেতরে কতটা ভয় জমে আছে।

কেউ জানত না সে কতটা কষ্ট লুকিয়ে বেঁচে আছে।

আরিয়ানও জানত না।

তবুও তার কথাটা মায়ার মনে গেঁথে গেল।

সেদিন রাতে অফিস প্রায় ফাঁকা।

মায়া শেষ রিপোর্টটা তৈরি করছিল।

হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।

চারপাশ অন্ধকার।

মায়ার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার মতো হলো।

বন্ধ ঘর।

অন্ধকার।

পুরোনো স্মৃতি হঠাৎ ঝড়ের মতো ফিরে এল।

সে চেয়ারের হাতল শক্ত করে ধরল।

আরিয়ান পাশের কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে বুঝতে পারল, মায়া অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে।

সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের ফোনের আলো জ্বালাল।

কিন্তু মায়ার কাছে এগিয়ে গেল না।

দূর থেকেই শান্ত গলায় বলল,

—"মায়া, ভয় পাবেন না।"

মায়া কোনো উত্তর দিতে পারল না।

আরিয়ান বলল,

—"আমি দরজা খুলে দিচ্ছি। আপনি বাইরে চলে যান।"

দরজা খুলে গেল।

মায়া দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এল।

কিছুক্ষণ পর সে স্বাভাবিক হলো।

আরিয়ান তখনও দূরে দাঁড়িয়ে।

সে শুধু বলল,

—"আপনাকে কেউ ভয় দেখাচ্ছে?"

মায়া মাথা নাড়ল।

—"না।"

—"তাহলে এত ভয় পেলেন কেন?"

মায়া নিচু গলায় বলল,

—"কিছু পুরোনো ব্যাপার আছে।"

আরিয়ান আর প্রশ্ন করল না।

শুধু বলল,

—"যখন ইচ্ছে হবে, তখন বলবেন।"

মায়া তার দিকে তাকাল।

আরিয়ান চলে গেল।

কিন্তু সেদিন রাতে প্রথমবার মায়ার মনে হলো—

সব পুরুষ একই রকম নয়।

আর সে জানত না, এই ধারণাটাই একদিন তার জীবনটাকে পুরোপুরি বদলে দেবে।


পরদিন সকালে অফিসে ঢুকেই মায়ার মনে হলো, গত রাতের ঘটনাটা যেন স্বপ্ন ছিল।

অফিসের সবাই আগের মতো ব্যস্ত।

কেউ ফাইল নিয়ে ছুটছে, কেউ মিটিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আরিয়ানও নিজের কেবিনে।

মায়া ডেস্কে বসে কম্পিউটার চালু করতেই তার সহকর্মী রিমি এসে বলল,

—"কাল এত রাতে অফিসে ছিলে?"

মায়া মাথা নাড়ল।

—"হ্যাঁ। কাজ শেষ করতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল।"

রিমি ফিসফিস করে বলল,

—"স্যার তো তোমাকে খুব কাজ দেন।"

মায়া মুচকি হেসে বলল,

—"আমারও তাই মনে হয়।"

ঠিক তখন কেবিনের দরজা খুলল।

আরিয়ান বাইরে এসে গম্ভীর গলায় বলল,

—"মায়া।"

মায়া সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

—"জি, স্যার?"

—"আমার কেবিনে আসুন।"

রিমি মায়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হাসল।

মায়া তাকে উপেক্ষা করে কেবিনে ঢুকল।

আরিয়ান একটা ফাইল তার দিকে এগিয়ে দিল।

—"এই রিপোর্টটা আজকের মধ্যে শেষ করতে হবে।"

মায়া ফাইল হাতে নিয়ে বলল,

—"জি।"

দরজার কাছে গিয়ে আবার থামল।

আরিয়ান বলল,

—"কিছু বলবেন?"

মায়া দ্বিধা করে বলল,

—"গত রাতের জন্য ধন্যবাদ।"

আরিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।

—"ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই।"

—"তবুও..."

—"ঠিক আছে। এবার যান।"

মায়া বেরিয়ে গেল।

আরিয়ান চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার নিজের কাছেই ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগছিল।

মায়া যখন তাকে ভয় পায়, তখন তার ভালো লাগে না।

বরং মেয়েটার চোখের ভয়টা দেখলে তার নিজের রাগটাই নিজের ওপর চলে আসে।

দুপুরের দিকে অফিসে একটা বড় মিটিং ছিল।

আরিয়ান সবাইকে নিয়ে কনফারেন্স রুমে বসেছিল।

একজন কর্মচারী ভুল একটা তথ্য উপস্থাপন করতেই আরিয়ান গম্ভীর হয়ে উঠল।

—"এই রিপোর্ট কে অনুমোদন করেছে?"

লোকটা কাঁপতে কাঁপতে বলল,

—"স্যার, আমি..."

—"আপনি কি জানেন, এই একটা ভুলের কারণে কোম্পানির কতটা ক্ষতি হতে পারে?"

রুম নিস্তব্ধ।

মায়া একপাশে বসে ছিল।

আরিয়ানের গলা একটু উঁচু হতেই তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

পুরোনো ভয় যেন আবার ফিরে এল।

আরিয়ান সেটা লক্ষ্য করল।

কথার মাঝেই থেমে গেল।

তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল,

—"ঠিক আছে। সবাই পাঁচ মিনিট বিরতি নিন।"

সবাই বেরিয়ে গেল।

মায়াও উঠতে যাচ্ছিল।

আরিয়ান বলল,

—"মায়া, একটু থাকুন।"

মায়ার বুক আবার কেঁপে উঠল।

আরিয়ান সেটা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—"ভয় পাওয়ার কিছু নেই।"

মায়া ধীরে বসে পড়ল।

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—"আমি যখন রাগ করি, তখন আপনাকে অস্বস্তি হয়?"

মায়া উত্তর দিল না।

—"হয়?"

মায়া খুব আস্তে বলল,

—"একটু।"

আরিয়ান মাথা নিচু করল।

তারপর বলল,

—"আমি চেষ্টা করব আপনার সামনে গলা না তুলতে।"

মায়া অবাক হয়ে তাকাল।

—"আপনি?"

—"হ্যাঁ।"

—"কিন্তু আপনি তো সবাইকে বকেন।"

—"সবাইকে আর আপনাকে একভাবে দেখি না।"

কথাটা বলেই আরিয়ান থেমে গেল।

মায়ার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।

আরিয়ানও যেন বুঝতে পারল, কথাটা বেশি হয়ে গেছে।

সে দ্রুত ফাইলের দিকে তাকিয়ে বলল,

—"আপনি যেতে পারেন।"

মায়া বেরিয়ে গেল।

কিন্তু সারা দিন তার মাথায় একটা কথাই ঘুরতে থাকল—

"সবাইকে আর আপনাকে একভাবে দেখি না।"

কয়েকদিন পর মায়ার প্রচণ্ড জ্বর হলো।

তবুও সে অফিসে এল।

আরিয়ান দূর থেকেই বুঝতে পারল, তার মুখ ফ্যাকাশে।

—"আপনার কী হয়েছে?"

—"কিছু না, স্যার।"

—"আপনার চোখ-মুখ দেখেছেন?"

—"সামান্য জ্বর।"

আরিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,

—"তাহলে অফিসে এসেছেন কেন?"

মায়া চুপ।

—"বাড়ি যান।"

—"কিন্তু আজ রিপোর্টটা..."

—"আমি বলেছি বাড়ি যান।"

—"স্যার, কাজটা শেষ না করে—"

আরিয়ান এবার একটু কঠিন গলায় বলল,

—"কাজের জন্য মানুষ মারা যায় না, কিন্তু অসুস্থ শরীরকে জোর করলে সমস্যা হয়।"

মায়া চুপ করে গেল।

আরিয়ান তার ডেস্কে রাখা ব্যাগটা এগিয়ে দিল।

—"চলুন।"

মায়া অবাক।

—"কোথায়?"

—"বাড়ি যাবেন।"

—"আমি নিজেই যেতে পারব।"

—"জানি। তবুও আমি আপনাকে গাড়িতে দিয়ে আসব।"

—"দরকার নেই।"

আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,

—"আপনি কি সবকিছুতেই আমার সঙ্গে তর্ক করবেন?"

মায়া একটু ভয় পেয়ে চুপ হয়ে গেল।

আরিয়ান তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, আবারও সে বেশি কঠিন হয়ে গেছে।

গলার স্বর নরম করে বলল,

—"চলুন।"

গাড়িতে বসে মায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

আরিয়ান গাড়ি চালাচ্ছিল।

কিছুক্ষণ পর সে বলল,

—"আপনি কি সবসময় একা থাকেন?"

—"মায়ের সঙ্গে।"

—"বাবা?"

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,

—"বাবা নেই।"

আরিয়ান আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামল।

মায়া দরজা খুলতে যাচ্ছিল।

আরিয়ান বলল,

—"এক মিনিট।"

সে গাড়ির পেছন থেকে একটা ওষুধের প্যাকেট বের করে দিল।

—"এগুলো খাবেন।"

মায়া অবাক হয়ে তাকাল।

—"আপনি কিনেছেন?"

—"হ্যাঁ।"

—"কেন?"

আরিয়ান স্বাভাবিক গলায় বলল,

—"কারণ আপনি অসুস্থ।"

মায়া মৃদু হেসে বলল,

—"আপনি বাইরে থেকে যতটা রাগী, ভেতরে ততটা না।"

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—"এই কথাটা কাউকে বলবেন না।"

মায়া হেসে ফেলল।

—"কেন?"

—"আমার ইমেজ নষ্ট হয়ে যাবে।"

দুজনেই হেসে ফেলল।

সেদিন প্রথমবার মায়া আরিয়ানকে ভয় না পেয়ে হাসল।

আরিয়ান গাড়ি চালাতে চালাতে আয়নার দিকে তাকিয়ে তার হাসিটা দেখল।

তার মনে হলো—

এই হাসিটা সে আরও অনেকবার দেখতে চায়।

দিনগুলো এভাবেই কাটতে লাগল।

মায়া বুঝতে পারছিল না, কখন আরিয়ানের উপস্থিতি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অফিসে ঢুকে প্রথমে সে আরিয়ানের কেবিনের দিকে তাকাত।

আরিয়ান আছে কি না দেখত।

আরিয়ান কোনোদিন তার ডেস্কের পাশে এসে দাঁড়ালে বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হতো।

কিন্তু নিজের মনকে সে কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।

তার অতীত তাকে শিখিয়েছিল—

কাউকে খুব কাছে আনলে কষ্ট পেতে হয়।

তাই সে দূরত্ব বজায় রাখত।

আরিয়ানও সেটা বুঝত।

সে কখনো জোর করত না।

বরং মায়ার সীমারেখাকে সম্মান করত।

একদিন অফিস শেষে মায়া বের হচ্ছিল।

হঠাৎ দেখল, বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি।

তার কাছে ছাতা নেই।

সে দাঁড়িয়ে ভাবছিল কী করবে।

পেছন থেকে আরিয়ান এসে একটা ছাতা এগিয়ে দিল।

—"নিন।"

মায়া বলল,

—"আপনি?"

—"আমার গাড়ি আছে।"

—"তাহলে?"

—"আপনার দরকার।"

মায়া ছাতাটা নিল।

—"কাল ফেরত দেব।"

আরিয়ান হেসে বলল,

—"রেখে দিন।"

—"কেন?"

—"আপনি আবার বৃষ্টিতে ভিজে অসুস্থ হয়ে অফিসে এসে বসবেন।"

মায়া হাসল।

—"আপনি সবকিছু খেয়াল করেন?"

আরিয়ান এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—"সবকিছু না।"

—"তাহলে?"

—"আপনার ব্যাপারগুলো একটু বেশি।"

মায়া থমকে গেল।

আরিয়ানও আর কিছু বলল না।

সে গাড়ির দিকে চলে গেল।

মায়া বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে রইল।

তার হাতে আরিয়ানের দেওয়া ছাতা।

মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি।

কিন্তু সেই অনুভূতির নাম সে জানত না।

এক রাতে অফিসে একটা জরুরি কাজ পড়ে গেল।

সবাই চলে যাওয়ার পর শুধু মায়া আর আরিয়ান ছিল।

মায়া কাজ করছিল।

হঠাৎ আরিয়ান বলল,

—"আজ আর দেরি করবেন না।"

মায়া তাকাল।

—"কাজটা শেষ হয়নি।"

—"কাল করবেন।"

—"কিন্তু..."

—"মায়া।"

কণ্ঠটা এবার খুব নরম।

—"সবসময় নিজের ওপর এত চাপ দেবেন না।"

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর আস্তে বলল,

—"আমার নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা খুব জরুরি।"

—"কেন?"

মায়া জানালার দিকে তাকাল।

—"কারও ওপর নির্ভর করতে চাই না।"

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—"সবাইকে বিশ্বাস করতে হবে না। কিন্তু কাউকে বিশ্বাস করা অসম্ভবও নয়।"

মায়া মৃদু হেসে বলল,

—"আমি পারি না।"

—"একদিন পারবেন।"

—"কীভাবে?"

আরিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—"যখন এমন কাউকে পাবেন, যে আপনার বিশ্বাস ভাঙার বদলে সেটা আগলে রাখবে।"

মায়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সে জানত না কেন।

শুধু মনে হলো—

এই কথাটা আরিয়ান নিজের জন্যই বলল।

আর সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার পথে মায়া প্রথমবার নিজের কাছে একটা প্রশ্ন করল—

"আমি কি আরিয়ান স্যারকে একটু একটু করে বিশ্বাস করতে শুরু করেছি?"

উত্তরটা সে জানত না।

কিন্তু তার হৃদয় হয়তো ইতিমধ্যেই জানত।


মায়া বুঝতে পারছিল, সে বদলে যাচ্ছে।

আগে অফিস মানেই ছিল কাজ।

এখন অফিসে ঢোকার পর অজান্তেই তার চোখ চলে যায় আরিয়ানের কেবিনের দিকে।

দরজা খোলা থাকলে বুকটা একটু হালকা লাগে।

আরিয়ান অফিসে না থাকলে অকারণেই মন খারাপ হয়ে যায়।

নিজের এই পরিবর্তনটা মায়া নিজেই বুঝতে পারছিল না।

তাই সে ইচ্ছে করেই আরিয়ানের কাছ থেকে একটু দূরে থাকার চেষ্টা করছিল।

কিন্তু আরিয়ান যেন সেটা মেনে নিতে পারছিল না।

সেদিন সকালে মায়া একটা মিটিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

হঠাৎ আরিয়ান এসে তার ডেস্কের সামনে দাঁড়াল।

—"মায়া।"

—"জি, স্যার?"

—"আজ দুপুরের ক্লায়েন্ট মিটিংয়ের প্রেজেন্টেশন আপনি করবেন।"

মায়া অবাক।

—"আমি?"

—"হ্যাঁ।"

—"কিন্তু আমি তো আগে কখনো..."

—"এই জন্যই করবেন।"

মায়া একটু নার্ভাস হয়ে বলল,

—"যদি ভুল হয়?"

আরিয়ান গম্ভীরভাবে বলল,

—"আমি আছি।"

মাত্র দুটো শব্দ।

কিন্তু মায়ার বুকের ভেতর যেন অদ্ভুত একটা সাহস এসে গেল।

—"ঠিক আছে।"

আরিয়ান চলে গেল।

দূর থেকে রিমি সব দেখছিল।

সে মায়ার কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,

—"একটা কথা বলব?"

—"কী?"

—"স্যার তোমাকে একটু বেশিই পছন্দ করেন মনে হয়।"

মায়া আঁতকে উঠল।

—"কী বলছিস!"

—"আমি যা দেখছি তাই বলছি।"

—"না, না। উনি শুধু কাজের জন্য—"

রিমি হেসে বলল,

—"হুম। কাজের জন্যই প্রতিদিন তোর দিকে তাকিয়ে থাকেন!"

মায়া আর কথা বাড়াল না।

কিন্তু কথাটা তার মাথায় আটকে গেল।

দুপুরের মিটিং ভালোভাবেই হলো।

মায়া আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পুরো প্রেজেন্টেশন শেষ করল।

মিটিং শেষে ক্লায়েন্টরা চলে গেলে আরিয়ান বলল,

—"ভালো হয়েছে।"

মায়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

—"সত্যি?"

—"হ্যাঁ।"

—"আপনি আজ আমাকে বকেননি।"

আরিয়ান ভ্রু তুলল।

—"আপনি কি চান আমি বকি?"

মায়া হেসে বলল,

—"না।"

—"তাহলে?"

—"আপনি যখন প্রশংসা করেন, তখন ভালো লাগে।"

কথাটা বলে মায়া নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল।

আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

—"আপনাকে খুশি দেখলে আমারও ভালো লাগে।"

মায়া আর দাঁড়াল না।

দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।

বাইরে এসে তার মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল।

নিজের ডেস্কে বসে সে মনে মনে বলল,

—"এই মানুষটা এত অদ্ভুত কেন?"

কয়েকদিন পর অফিসে নতুন একজন কর্মী যোগ দিল।

নাম সামি।

হাসিখুশি, প্রাণবন্ত ছেলে।

প্রথম দিন থেকেই সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ফেলল।

মায়ার সঙ্গেও খুব সহজভাবে কথা বলত।

একদিন দুপুরে সামি মায়াকে বলল,

—"লাঞ্চ করেছেন?"

—"না।"

—"চলুন, একসঙ্গে করি।"

মায়া হাসল।

—"ঠিক আছে।"

দুজন কথা বলতে বলতে ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছিল।

ঠিক তখন আরিয়ান কেবিন থেকে বের হলো।

তার চোখ পড়ল দুজনের দিকে।

মায়া হাসছে।

সামিও হাসছে।

আরিয়ানের মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল।

সে কিছু বলল না।

শুধু নিজের কেবিনে ফিরে গেল।

মায়া বিষয়টা খেয়াল করেনি।

বিকেলে মায়াকে আরিয়ানের কেবিনে ডাকা হলো।

মায়া ঢুকতেই আরিয়ান একটা ফাইল তার দিকে ছুড়ে দিল না, কিন্তু বেশ কঠিনভাবে বলল,

—"এই রিপোর্টটা আজকেই শেষ করবেন।"

মায়া অবাক।

—"আজ?"

—"হ্যাঁ।"

—"কিন্তু এটা তো আগামী সপ্তাহের জন্য ছিল।"

—"আমি জানি।"

—"তাহলে আজ কেন?"

আরিয়ান ঠান্ডা গলায় বলল,

—"কারণ এখন দরকার।"

মায়া ফাইল হাতে নিল।

—"জি।"

সে বেরিয়ে যাচ্ছিল।

আরিয়ান হঠাৎ বলল,

—"আর সামির সঙ্গে গল্প করার সময় থাকলে কাজ করার সময়ও থাকা উচিত।"

মায়া থমকে গেল।

ধীরে ঘুরে তাকাল।

—"স্যার?"

আরিয়ান নিজের ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে বলল,

—"কিছু না।"

মায়া বুঝতে পারল।

তার চোখে অভিমান ফুটে উঠল।

—"আমি কাজ ফাঁকি দিইনি।"

—"আমি তা বলিনি।"

—"কিন্তু আপনি এমনভাবে বললেন..."

আরিয়ান তাকাল।

—"আপনি আমার সঙ্গে তর্ক করছেন?"

মায়া চুপ করে গেল।

—"না।"

—"তাহলে যান।"

মায়া বেরিয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার পর আরিয়ান চোখ বন্ধ করল।

সে নিজেই বুঝতে পারছিল না কেন সামির সঙ্গে মায়াকে দেখে তার এত রাগ হয়েছিল।

হয়তো কারণটা খুব সহজ।

সে মায়াকে অন্য কারও সঙ্গে এত স্বচ্ছন্দে দেখতে পারে না।

কিন্তু এই অনুভূতির নাম স্বীকার করার সাহস তারও তখনও হয়নি।

সেদিন রাতে মায়া অনেকক্ষণ কাজ করল।

রাগে।

অভিমানে।

তার মনে হচ্ছিল, আরিয়ান তাকে অন্যায়ভাবে অপমান করেছে।

রাত প্রায় দশটা।

মায়া ব্যাগ গুছিয়ে বের হতে যাবে, তখন আরিয়ান তার সামনে এসে দাঁড়াল।

—"এখনও যাননি?"

মায়া ঠান্ডা গলায় বলল,

—"আপনি তো কাজ দিয়েছিলেন।"

আরিয়ান বুঝতে পারল, সে রাগ করে আছে।

—"আমি একটু বেশি কঠিন হয়ে গিয়েছিলাম।"

মায়া চুপ।

—"মায়া।"

—"জি?"

—"রাগ করেছেন?"

—"না।"

—"মিথ্যা বলছেন।"

মায়া এবার তাকাল।

—"আপনি আমাকে সবার সামনে ভুল বোঝেন, তারপর বলেন রাগ করিনি?"

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—"সরি।"

মায়া যেন বিশ্বাসই করতে পারল না।

—"আপনি সরি বললেন?"

আরিয়ান মৃদু হাসল।

—"হ্যাঁ।"

—"আপনি তো কখনো ভুল স্বীকার করেন না।"

—"আপনার সামনে করি।"

মায়ার মুখ নরম হয়ে গেল।

আরিয়ান বলল,

—"চলুন, আপনাকে বাড়ি দিয়ে আসি।"

—"না।"

—"কেন?"

—"আমি নিজে যাব।"

আরিয়ান কিছু বলল না।

শুধু তার পাশে হাঁটতে লাগল।

অফিসের বাইরে এসে দেখা গেল বৃষ্টি হচ্ছে।

আরিয়ান নিজের ছাতাটা খুলে মায়ার মাথার ওপর ধরল।

মায়া বলল,

—"আপনি?"

—"আমি ভিজলে সমস্যা নেই।"

মায়া লক্ষ্য করল, ছাতাটা পুরোপুরি তার দিকেই ধরা।

আরিয়ানের এক পাশের কাঁধ ভিজে যাচ্ছে।

মায়া আস্তে বলল,

—"ছাতাটা মাঝখানে ধরুন।"

—"আপনি ভিজবেন।"

—"আপনিও তো ভিজছেন।"

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—"আপনি ভিজলে আমার বেশি খারাপ লাগে।"

মায়া থেমে গেল।

বৃষ্টির শব্দের মধ্যে দুজন কিছুক্ষণ নীরব।

মায়া চোখ নামিয়ে ফেলল।

তার মনে হলো—

কেউ তাকে এভাবে যত্ন করে কথা বলেছে, অনেক বছর হয়ে গেছে।

পরদিন সকালে মায়া অফিসে এসে নিজের ডেস্কে একটা ছোট্ট কাগজ পেল।

তাতে লেখা—

"গত রাতের জন্য ধন্যবাদ। রাগ করে থেকেও আমার সঙ্গে হাঁটলেন।"

নিচে কোনো নাম নেই।

মায়া বুঝতে পারল কে লিখেছে।

সে কাগজটা ব্যাগের ভেতর রেখে দিল।

সারাদিন অকারণে তার মুখে হাসি লেগে রইল।

কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না।

একদিন বিকেলে মায়া অফিসের করিডোর দিয়ে যাচ্ছিল।

হঠাৎ সে শুনল, আরিয়ান কারও সঙ্গে কথা বলছে।

একজন সুন্দরী নারী তার কেবিনে দাঁড়িয়ে।

নারীটি হাসতে হাসতে বলছিল,

—"আরিয়ান, এত বছর পরও তুমি একটুও বদলাওনি।"

মায়া থেমে গেল।

আরিয়ানও হেসে বলল,

—"তুমিও না।"

মায়ার বুকের ভেতর কেমন যেন হলো।

সে জানত না মেয়েটা কে।

কিন্তু কেন জানি না, দৃশ্যটা তার একদম ভালো লাগল না।

সে দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল।

সন্ধ্যায় আরিয়ান মায়াকে ডাকল।

—"মায়া।"

—"জি?"

—"আজ এত চুপচাপ কেন?"

—"কিছু না।"

—"কিছু হয়েছে।"

—"না।"

আরিয়ান একটু কাছে এসে বলল,

—"আমার দিকে তাকান।"

মায়া তাকাল না।

—"মায়া।"

সে এবার তাকাল।

আরিয়ান বলল,

—"আপনি কি আমার ওপর রাগ করেছেন?"

—"না।"

—"তাহলে চোখে এত অভিমান কেন?"

মায়া চুপ করে রইল।

তারপর আস্তে বলল,

—"আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমার জানার দরকার নেই।"

আরিয়ান অবাক।

—"কী বলতে চাইছেন?"

—"কিছু না।"

মায়া বেরিয়ে গেল।

আরিয়ান তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ হেসে ফেলল।

কারণ সে বুঝে গেছে—

মায়া ঈর্ষা করেছে।

আর সেই উপলব্ধিতে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল।

সে জানত না, মায়া তাকে কতটা জায়গা দিয়েছে।

কিন্তু আজ প্রথমবার সে বুঝল—

মায়ার অভিমানেও তার জন্য একটা জায়গা তৈরি হয়েছে।

আর সেই জায়গাটা সে আর হারাতে চায় না।


পরদিন সকাল থেকেই মায়ার মনটা খারাপ।

নিজের কাছেই সে বিরক্ত।

কারণ গতকাল আরিয়ানের কেবিনে দেখা সেই মেয়েটাকে নিয়ে সে সারারাত ভেবেছে।

কে ছিল মেয়েটা?

আরিয়ান তাকে এত আপন করে কথা বলছিল কেন?

তার ওপর আবার—

"তুমি একটুও বদলাওনি।"

কথাটা মায়ার মাথা থেকে বের হচ্ছিল না।

কিন্তু মায়ার সবচেয়ে বেশি রাগ হচ্ছিল নিজের ওপর।

আরিয়ানের ব্যক্তিগত ব্যাপারে তার এত ভাবনা কেন?

সে তো আরিয়ানের কেউ নয়।

শুধু একজন কর্মচারী।

তাহলে এই অদ্ভুত কষ্টটা কেন?

সকাল দশটার দিকে আরিয়ান অফিসে ঢুকল।

প্রতিদিনের মতো তার চোখ প্রথমেই মায়ার ডেস্ক খুঁজল।

মায়া মাথা নিচু করে কাজ করছে।

আরিয়ান তার ডেস্কের কাছে এসে দাঁড়াল।

—"গুড মর্নিং।"

মায়া কম্পিউটার থেকে চোখ না সরিয়ে বলল,

—"গুড মর্নিং, স্যার।"

আরিয়ান বুঝল, ব্যাপারটা এখনও ঠিক হয়নি।

—"আজ কেমন আছেন?"

—"ভালো।"

—"আমার ওপর রাগ এখনও আছে?"

—"না।"

—"তাহলে আমার দিকে তাকাচ্ছেন না কেন?"

মায়া এবার তাকাল।

—"আমি কাজ করছি।"

আরিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

—"ঠিক আছে। কাজ করুন।"

সে চলে গেল।

কিন্তু যাওয়ার সময় একবার পেছনে তাকাতে ভুলল না।

দুপুরে মায়াকে একটা মিটিংয়ে যেতে হলো।

সেখানে একজন ক্লায়েন্টের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে হলো।

লোকটা মায়ার সঙ্গে খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিল।

একপর্যায়ে বলল,

—"আপনি চাইলে মিটিংয়ের পর কফি খেতে যেতে পারি।"

মায়া ভদ্রভাবে বলল,

—"দুঃখিত, আমার কাজ আছে।"

ঠিক তখন দূর থেকে আরিয়ান তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।

তার মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল।

মিটিং শেষ হওয়ার পর মায়া নিজের ডেস্কে ফিরতেই আরিয়ান তাকে ডাকল।

—"আমার কেবিনে আসুন।"

মায়া গিয়ে দাঁড়াল।

—"জি?"

আরিয়ান বলল,

—"ওই ক্লায়েন্টের সঙ্গে আপনার এত কথা কীসের?"

মায়া অবাক।

—"কাজের কথা।"

—"কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও?"

—"উনি কিছু জানতে চাচ্ছিলেন।"

আরিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,

—"অফিসে ব্যক্তিগত আলাপ করবেন না।"

মায়া এবার রেগে গেল।

—"আমি কোনো ব্যক্তিগত আলাপ করিনি।"

—"আমি শুধু বলছি—"

—"আপনি সবসময় আমাকে ভুল বোঝেন।"

আরিয়ান থেমে গেল।

মায়ার চোখে পানি চিকচিক করছে।

—"আমি কাজ করি। মন দিয়ে করি। তবুও আপনি যেন সবসময় আমার কোনো না কোনো ভুল খুঁজে বের করেন।"

আরিয়ান ধীরে বলল,

—"আমি আপনার ভুল খুঁজছি না।"

—"তাহলে?"

কিছুক্ষণ নীরবতা।

আরিয়ান শেষ পর্যন্ত বলল,

—"আমি আপনাকে নিয়ে বেশি চিন্তা করি।"

মায়া চুপ হয়ে গেল।

আরিয়ানও যেন নিজের মুখ থেকে কথাটা বেরিয়ে যাওয়ায় অস্বস্তিতে পড়ল।

—"আপনি যেতে পারেন।"

মায়া বেরিয়ে গেল।

কিন্তু এবার তার রাগের সঙ্গে অন্য কিছু মিশে গেল।

একটা অদ্ভুত উষ্ণতা।

সন্ধ্যায় অফিস ফাঁকা হয়ে এলো।

মায়া ব্যাগ গুছিয়ে বের হচ্ছিল।

আরিয়ান কেবিন থেকে বেরিয়ে বলল,

—"মায়া।"

সে থামল।

—"জি?"

—"আজ আমার সঙ্গে ডিনার করবেন?"

মায়া অবাক।

—"কেন?"

—"আপনার সঙ্গে কথা আছে।"

—"কাজের?"

আরিয়ান মৃদু হাসল।

—"না।"

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—"ঠিক আছে।"

শহরের একটি শান্ত রেস্টুরেন্টে দুজন মুখোমুখি বসেছিল।

মায়া খুব অস্বস্তিতে।

আরিয়ানও অস্বাভাবিকভাবে চুপ।

শেষ পর্যন্ত মায়াই বলল,

—"আপনি কী বলতে চেয়েছিলেন?"

আরিয়ান গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বলল,

—"কাল যে মেয়েটাকে দেখেছিলেন..."

মায়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলল।

—"আমি কিছু জিজ্ঞেস করিনি।"

—"কিন্তু আপনার চোখে প্রশ্ন ছিল।"

মায়া চুপ।

আরিয়ান বলল,

—"ও আমার ছোটবেলার বন্ধু।"

মায়া তাকাল।

—"শুধু বন্ধু?"

—"হ্যাঁ।"

—"আর কিছু না?"

আরিয়ান হেসে বলল,

—"আপনি কি ঈর্ষা করেছিলেন?"

মায়ার মুখ লাল হয়ে গেল।

—"না!"

—"নিশ্চিত?"

—"জি।"

—"তাহলে এত রাগ করেছিলেন কেন?"

মায়া চুপ করে গেল।

আরিয়ান একটু ঝুঁকে বলল,

—"মায়া, আপনি কি জানেন, আপনার অভিমান আমার ভালো লাগে?"

মায়া অবাক।

—"কেন?"

—"কারণ তখন বুঝি, আপনি আমাকে নিয়ে ভাবেন।"

মায়া কিছু বলল না।

আরিয়ান ধীরে বলল,

—"আমি আপনাকে একটা কথা বলব?"

—"জি।"

—"আমি জানি না কখন থেকে আপনি আমার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলেন।"

মায়ার বুক ধক করে উঠল।

—"কিন্তু এখন আপনি অফিসে না থাকলে আমার ভালো লাগে না।"

মায়া নিঃশ্বাস আটকে শুনছিল।

—"আপনি অন্য কারও সঙ্গে হাসলে আমার রাগ হয়।"

মায়ার চোখ বড় হয়ে গেল।

—"আপনি আমার ওপর রাগ করলে আমি সারাদিন অস্বস্তিতে থাকি।"

আরিয়ান কিছুক্ষণ থামল।

তারপর বলল,

—"হয়তো এটাই ভালোবাসার শুরু।"

মায়ার চোখ ভিজে উঠল।

সে মাথা নিচু করে বলল,

—"আমি ভয় পাই।"

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল।

—"কিসের?"

মায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—"কাউকে বিশ্বাস করতে।"

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে রইল।

সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

শুধু বলল,

—"আপনাকে এখনই আমাকে বিশ্বাস করতে হবে না।"

মায়া তাকাল।

—"তাহলে?"

—"আমি সময় দেব।"

—"কতদিন?"

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—"যতদিন লাগে।"

সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার পর মায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার নিজের মুখটা আজ অচেনা লাগছিল।

কখন যে সে আরিয়ানের জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করেছে, সে জানে না।

কখন তার রাগ আরিয়ানের জন্য কষ্টে পরিণত হয়েছে, তাও জানে না।

কিন্তু একটা বিষয় সে বুঝেছিল—

আরিয়ানকে হারানোর চিন্তা তার ভালো লাগে না।

পরের কয়েক সপ্তাহে তাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হলো।

আরিয়ান মায়ার জন্য আলাদা করে কাজের সময় ঠিক করল।

রাত করে অফিসে থাকতে দিত না।

মায়া অসুস্থ হলে নিজে খোঁজ নিত।

মায়া কোনোদিন চুপচাপ থাকলে কারণ না জেনে ছাড়ত না।

আর মায়াও ধীরে ধীরে আরিয়ানের সামনে নিজের স্বাভাবিক রূপটা দেখাতে শুরু করল।

একদিন মায়া রাগ করে বলল,

—"আপনি ভীষণ জেদি।"

আরিয়ান বলল,

—"আপনিও।"

—"আমি?"

—"হ্যাঁ।"

—"কীভাবে?"

—"আমি কাছে আসতে চাইলে আপনি দূরে সরে যান।"

মায়া চুপ।

আরিয়ান একটু নরম হয়ে বলল,

—"কিন্তু আমি অপেক্ষা করব।"

মায়া তাকিয়ে মৃদু হাসল।

এক সন্ধ্যায় প্রচণ্ড বৃষ্টি নামল।

মায়া অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল।

আরিয়ান পাশে এসে দাঁড়াল।

—"বৃষ্টি ভালো লাগে?"

—"অনেক।"

—"কেন?"

মায়া বলল,

—"বৃষ্টির শব্দে অনেক পুরোনো শব্দ চাপা পড়ে যায়।"

আরিয়ান তার দিকে তাকাল।

কথাটার গভীরতা সে বুঝতে পারল না।

কিন্তু মায়ার চোখে হঠাৎ একটা বিষণ্ণতা দেখতে পেল।

সে জিজ্ঞেস করল না।

শুধু নিজের হাতের ছাতাটা মায়ার দিকে এগিয়ে দিল।

—"আজও রাখবেন?"

মায়া হাসল।

—"এটা তো আগেও দিয়েছিলেন।"

—"তাহলে বুঝি আপনার কাছে আছে?"

—"হ্যাঁ।"

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—"তাহলে সেটা ফেরত চাই না।"

মায়া অবাক হয়ে তাকাল।

—"কেন?"

—"কারণ ওই ছাতাটা আপনার কাছে থাকলে অন্তত একটা জিনিস থাকবে, যেটা আপনাকে মনে করিয়ে দেবে—কেউ একজন আপনার পাশে দাঁড়াতে চায়।"

মায়ার চোখ ভিজে উঠল।

সে কিছু বলতে পারল না।

কিন্তু সুখের সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভয়ও ফিরে আসছিল।

মায়ার মনে হচ্ছিল, সে যদি আরিয়ানের খুব কাছে যায়, তাহলে একদিন না একদিন সব হারাবে।

তার অতীত কি আরিয়ান জানলে তাকে ঘৃণা করবে?

তার কি মনে হবে মায়া কোনো দোষ করেছে?

এই প্রশ্নগুলো তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।

এক রাতে সে পুরোনো একটা বাক্স খুলল।

সেখানে কয়েকটা পুরোনো ছবি।

তৃষার সঙ্গে স্কুলের ছবি।

অর্ণবের দেওয়া একটা পুরোনো কাগজ।

মায়া অনেকক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হলো, সে যতই পালাতে চায়, অতীত তার পিছু ছাড়ছে না।

আর এখন তার জীবনে এমন একজন মানুষ এসেছে, যাকে সে হারাতে চায় না।

কিন্তু সত্যিটা জানালে?

যদি আরিয়ানও অন্য সবার মতো তাকে ভুল বোঝে?

মায়া চোখের পানি মুছে বাক্সটা বন্ধ করে দিল।

সে তখনও জানত না—

একদিন এই অতীতই তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।


মায়া কয়েকদিন ধরে অস্বাভাবিক চুপচাপ।

অফিসে কাজ করছে, কথা বলছে, হাসিও দিচ্ছে।

কিন্তু আরিয়ান বুঝতে পারছিল—

এই হাসির ভেতরে কিছু একটা লুকিয়ে আছে।

আগের মতো মায়া আর নিজের কথা বলছে না।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করলে বলছে,

—"কিছু হয়নি।"

কিন্তু আরিয়ান জানে, মায়ার "কিছু হয়নি" কথাটার ভেতরেই সবচেয়ে বেশি কিছু লুকিয়ে থাকে।

একদিন দুপুরে মায়া রিপোর্ট নিয়ে আরিয়ানের কেবিনে ঢুকল।

—"স্যার, এই ফাইলটা।"

আরিয়ান ফাইলটা নিল।

তারপর বলল,

—"বসুন।"

মায়া অবাক।

—"কেন?"

—"আপনার সঙ্গে কথা আছে।"

মায়া বসে পড়ল।

আরিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—"আপনি কি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন?"

মায়া চমকে উঠল।

—"না তো।"

—"এড়িয়ে যাচ্ছেন।"

—"আমি কাজ করছি।"

—"আগে কাজের মাঝেও কথা বলতেন। এখন শুধু কাজের কথা বলেন।"

মায়া চুপ করে গেল।

আরিয়ান ধীরে বলল,

—"আমার সঙ্গে কোনো সমস্যা হয়েছে?"

মায়া মাথা নাড়ল।

—"না।"

—"তাহলে?"

মায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—"আমি ভয় পাচ্ছি।"

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল।

—"আমাকে?"

—"না।"

—"তাহলে?"

মায়া উত্তর দিল না।

আরিয়ান এবার খুব নরম গলায় বলল,

—"মায়া, আপনি যদি আমার কাছে কিছু বলতে না চান, আমি জোর করব না।"

সে একটু থামল।

—"কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন—আপনার অতীত যা-ই হোক, সেটা আপনার পুরো পরিচয় না।"

মায়ার চোখ ভিজে উঠল।

সে মাথা নিচু করে বলল,

—"আপনি যদি সব জানতেন, হয়তো এমন কথা বলতেন না।"

আরিয়ান উঠে এসে তার সামনে দাঁড়াল।

—"তাহলে একদিন সব বলবেন।"

মায়া তাকাল।

—"যেদিন সাহস পাবেন।"

মায়ার চোখ দিয়ে একটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

আরিয়ান সেটা দেখে হাত বাড়িয়েও থেমে গেল।

সে জানে, মায়ার সীমারেখা তাকে সম্মান করতে হবে।

শুধু বলল,

—"কাঁদবেন না।"

মায়া চোখ মুছে ফেলল।

কয়েকদিন পর আরিয়ান মায়াকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল।

তার মা-বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে।

মায়া প্রচণ্ড নার্ভাস ছিল।

—"আমি যদি ওনাদের পছন্দ না হই?"

আরিয়ান হেসে বলল,

—"অসম্ভব।"

—"কীভাবে জানেন?"

—"কারণ আমার পছন্দ খারাপ না।"

মায়া লজ্জা পেয়ে বলল,

—"আপনি নিজেকে খুব পছন্দ করেন।"

—"না।"

—"তাহলে?"

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—"আপনাকে।"

মায়া চুপ করে গেল।

আরিয়ানের মা মায়াকে প্রথম দেখাতেই খুব পছন্দ করলেন।

তিনি মায়ার হাত ধরে বললেন,

—"তুমি খুব শান্ত মেয়ে।"

মায়া হেসে বলল,

—"জি।"

—"আরিয়ান ছোটবেলা থেকে খুব রাগী। ওকে সামলাতে পারবে?"

মায়া আরিয়ানের দিকে তাকাল।

আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,

—"মা!"

সবাই হেসে ফেলল।

মায়াও হেসে উঠল।

সেদিন অনেকদিন পর সে এমন একটা পরিবারের উষ্ণতা অনুভব করল, যেখানে তাকে কেউ বিচার করছে না।

বাড়ি ফেরার সময় আরিয়ান গাড়ি চালাচ্ছিল।

মায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—"আপনার মা খুব ভালো।"

—"হ্যাঁ।"

—"উনি আমাকে পছন্দ করেছেন?"

—"খুব।"

—"আপনি কীভাবে জানলেন?"

—"কারণ উনি আমাকে বলেছে, তোকে যেন আর বেশি অপেক্ষা না করাই।"

মায়া হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।

—"কিসের অপেক্ষা?"

আরিয়ান গাড়ি থামাল।

তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

—"বিয়ের।"

মায়ার বুক কেঁপে উঠল।

—"বিয়ে?"

—"হ্যাঁ।"

—"আপনি কি সত্যি...?"

—"হ্যাঁ, মায়া।"

আরিয়ান তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—"আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।"

মায়ার চোখ ভিজে উঠল।

কিন্তু আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে ভয়ও এসে গেল।

সে ধীরে বলল,

—"আপনি আমাকে পুরোপুরি জানেন না।"

—"জানি।"

—"না, জানেন না।"

—"যতটুকু জানি, তাতেই তোমাকে ভালোবাসি।"

মায়া চোখ নামিয়ে ফেলল।

—"আমার কিছু অতীত আছে।"

—"সব মানুষেরই থাকে।"

—"আমারটা হয়তো অন্যরকম।"

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—"যত কঠিনই হোক, আমি শুনব।"

মায়া কিছু বলতে পারল না।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো।

মায়ার মা প্রথমে কিছুটা অবাক হলেও পরে আরিয়ানের পরিবার সম্পর্কে জেনে রাজি হয়ে গেলেন।

বিয়ের আগে আরিয়ান মায়াকে একটা আংটি পরিয়ে বলল,

—"একটা কথা প্রতিশ্রুতি দাও।"

—"কী?"

—"যাই হোক, আমাকে ছেড়ে একা কষ্ট পাবে না।"

মায়ার বুকটা কেঁপে উঠল।

সে শুধু বলল,

—"চেষ্টা করব।"

আরিয়ান মৃদু হাসল।

—"চেষ্টা না। প্রতিশ্রুতি।"

মায়া তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—"প্রতিশ্রুতি।"

বিয়ের দিন চলে এল।

মায়া লাল শাড়ি পরে বসে ছিল।

চারদিকে মানুষ।

আলো।

ফুল।

হাসি।

কিন্তু তার ভেতরে ভয়।

তার মনে হচ্ছিল—

এই মানুষটা যদি একদিন সত্যিটা জেনে তাকে ঘৃণা করে?

তারপর?

সে কি আবার সেই পনেরো বছরের মেয়েটার মতো একা হয়ে যাবে?

বিয়ের পর রাতে আরিয়ান যখন তার পাশে এসে বসে, মায়া অস্বস্তিতে হাত মুঠো করে রাখল।

আরিয়ান সেটা বুঝতে পারল।

সে দূরত্ব রেখে বলল,

—"ভয় পাচ্ছ?"

মায়া চুপ।

আরিয়ান মৃদু স্বরে বলল,

—"তোমাকে কোনো কিছুতে তাড়াহুড়ো করতে হবে না।"

মায়া তার দিকে তাকাল।

আরিয়ান বলল,

—"আমাদের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো তোমার স্বস্তি।"

মায়ার চোখ ভিজে গেল।

সে আস্তে বলল,

—"আপনি এত ভালো কেন?"

আরিয়ান হেসে বলল,

—"কারণ তুমি আমাকে ভালো হতে বাধ্য করেছ।"

মায়া প্রথমবার নিজের ইচ্ছায় তার হাত ধরল।

আরিয়ান হাতটা শক্ত করে ধরল না।

শুধু স্থিরভাবে ধরে রাখল।

সেই রাতে মায়ার মনে হলো—

হয়তো এবার সত্যিই সে নিরাপদ।

বিয়ের পর দিনগুলো অদ্ভুত সুন্দর হয়ে উঠল।

সকালে আরিয়ান অফিসে যাওয়ার আগে মায়ার জন্য চা বানিয়ে রাখত।

মায়া কখনো তার টাই ঠিক করে দিত।

কখনো আরিয়ান ইচ্ছে করে ভুল করে টাই বাঁধত, শুধু মায়া যেন এসে ঠিক করে দেয়।

একদিন মায়া বলল,

—"আপনি তো ইচ্ছে করেই ভুল করেন।"

আরিয়ান হেসে বলল,

—"তাহলে?"

—"আমাকে দিয়ে কাজ করানোর জন্য।"

—"হ্যাঁ।"

—"আপনি খুব চালাক।"

—"তোমার সামনে একটু বেশি।"

মায়া হেসে ফেলল।

তাদের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন সবচেয়ে সুন্দর হয়ে উঠছিল।

কিন্তু মায়ার অতীত তখনও তার সঙ্গে ছিল।

এক রাতে মায়া হঠাৎ ঘুমের মধ্যে কেঁপে উঠল।

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে জেগে গেল।

—"মায়া?"

মায়া ঘুমের ঘোরে কাঁদছিল।

আরিয়ান তাকে জাগানোর চেষ্টা করল না।

শুধু পাশে বসে রইল।

কিছুক্ষণ পর মায়ার ঘুম ভাঙল।

সে বুঝতে পারল, আরিয়ান তার পাশে বসে আছে।

—"কী হয়েছে?"

মায়া মাথা নাড়ল।

—"কিছু না।"

আরিয়ান ধীরে বলল,

—"আবার সেই পুরোনো ভয়?"

মায়ার চোখে পানি।

সে মাথা নিচু করল।

আরিয়ান তার হাত ধরল।

—"আমি আছি।"

এই তিনটা শব্দ শুনেই মায়ার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল।

সে আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরল।

অনেকক্ষণ পর আস্তে বলল,

—"একদিন সব বলব।"

আরিয়ান তার মাথায় হাত রেখে বলল,

—"আমি অপেক্ষা করব।"

কিন্তু মায়া জানত না—

সেই "একদিন" খুব কাছে চলে এসেছে।

কারণ পরদিন সকালে এমন একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে, যা তার লুকিয়ে রাখা অতীতকে আবার তার সামনে এনে দাঁড় করাবে।


সকালের শুরুটা অন্য দিনের মতোই ছিল।

মায়া রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে চা বানাচ্ছিল।

আরিয়ান ডাইনিং টেবিলে বসে ল্যাপটপে অফিসের কিছু কাজ দেখছিল।

হঠাৎ মায়া বলল,

—"আজ এত সকালেই কাজ?"

আরিয়ান চোখ না তুলেই বলল,

—"আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে।"

মায়া চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল,

—"চিনি কম দিয়েছি।"

আরিয়ান কাপটা হাতে নিয়ে মুচকি হাসল।

—"তুমি না থাকলে আমি বুঝতেই পারতাম না, চায়ে চিনি কতটা লাগে।"

মায়া হাসল।

—"অভ্যাস হয়ে গেছে।"

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—"তুমিও।"

মায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,

—"আমি কী?"

—"অভ্যাস।"

মায়ার মুখ লাল হয়ে গেল।

—"অফিসে যান।"

আরিয়ান হেসে ফেলল।

সেই হাসিটা কয়েক ঘণ্টা পরেই হারিয়ে যাবে, তারা কেউ জানত না।

দুপুরের দিকে মায়ার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল এল।

সে প্রথমে ধরতে চাইল না।

কিন্তু কল বারবার আসতে থাকায় শেষ পর্যন্ত ধরল।

—"হ্যালো?"

ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর একটা নারী কণ্ঠ—

—"মায়া?"

মায়ার বুকের ভেতর হঠাৎ কেঁপে উঠল।

এই কণ্ঠটা সে চিনতে পেরেছে।

তৃষা।

মায়া কিছু বলল না।

তৃষা কাঁপা গলায় বলল,

—"তুই কি আমার সঙ্গে একবার দেখা করবি?"

মায়া ফোন কেটে দিল।

তার হাত কাঁপছিল।

এত বছর পর তৃষা কেন ফোন করেছে?

কেন এখন?

সে ফোনটা টেবিলে রেখে কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করল।

কিন্তু পুরোনো স্মৃতিগুলো আবার মাথার ভেতর ঘুরতে লাগল।

সেই বাড়ি।

সেই ঘর।

সেই ভয়।

সেই রাত।

মায়া চোখ বন্ধ করল।

না।

সে অতীতে ফিরে যেতে চায় না।

তার এখন আরিয়ান আছে।

তার একটা সংসার আছে।

সে সুখী।

কিন্তু অতীত কি এত সহজে ছেড়ে যায়?

সন্ধ্যায় আরিয়ান বাড়ি ফিরে দেখল, মায়া বারান্দায় একা বসে আছে।

চোখ দুটো লাল।

সে কাছে গিয়ে বলল,

—"কেঁদেছ?"

মায়া দ্রুত চোখ মুছে বলল,

—"না।"

আরিয়ান তার পাশে বসে পড়ল।

—"মিথ্যা বলছ।"

মায়া চুপ।

—"কী হয়েছে?"

—"কিছু না।"

আরিয়ান তার হাত ধরল।

—"আমার সঙ্গে 'কিছু না' বলবে না।"

মায়া হাতটা সরিয়ে নিল।

আরিয়ান অবাক হলো।

—"মায়া?"

মায়া উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

—"আমি একটু একা থাকতে চাই।"

সে ঘরে চলে গেল।

আরিয়ান তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

মায়ার আচরণে সে প্রথমবার সত্যিকারের ভয় পেল।

রাতে মায়া ঘুমাতে পারছিল না।

আরিয়ান পাশে শুয়ে ছিল।

সে বুঝতে পারছিল, আরিয়ান জেগে আছে।

কিছুক্ষণ পর আরিয়ান বলল,

—"আজ তুমি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ কেন?"

মায়া চুপ।

—"আমার ওপর রাগ?"

—"না।"

—"তাহলে?"

মায়া চোখ বন্ধ করে বলল,

—"আপনি যদি আমার সম্পর্কে এমন কিছু জানেন, যা আপনাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দেবে?"

আরিয়ান উঠে বসল।

—"তুমি কী বলতে চাইছ?"

মায়ার চোখে পানি চলে এল।

—"আমি ভয় পাচ্ছি।"

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—"আমি তোমার স্বামী। তোমার বিচারক না।"

মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—"সব কথা এত সহজ না।"

—"তাহলে কঠিন কথাটাই বলো।"

মায়া মুখ খুলেও কিছু বলতে পারল না।

তারপর হঠাৎ উঠে চলে গেল।

আরিয়ান তাকে থামাল না।

পরদিন দুপুরে মায়া অবশেষে তৃষার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হলো।

একটা নিরিবিলি ক্যাফেতে বসেছিল দুজন।

তৃষা অনেকক্ষণ মায়ার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

—"আমি জানি, তুই আমাকে ঘৃণা করিস।"

মায়া ঠান্ডা গলায় বলল,

—"তুই কী চাস?"

তৃষার চোখে পানি।

—"ক্ষমা চাইতে।"

মায়া হেসে ফেলল।

—"কিসের জন্য?"

তৃষা মাথা নিচু করল।

—"সেদিন যা হয়েছিল..."

মায়ার মুখ শক্ত হয়ে গেল।

—"তুই জানতিস?"

তৃষা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—"আমি জানতাম না অর্ণব এমন কিছু করবে। আমি ভেবেছিলাম তোমরা কথা বলবে।"

মায়ার চোখ ভিজে উঠল।

—"তুই আমাকে একা রেখে চলে গিয়েছিলি।"

—"আমি পরে বুঝেছিলাম কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু তুই আমার সঙ্গে কথা বলিসনি।"

—"কারণ আমি ভেবেছিলাম তুই আমাকে ধোঁকা দিয়েছিস।"

তৃষা কাঁদছিল।

—"আমি তোকে কখনো ধোঁকা দিতে চাইনি।"

মায়া কিছু বলল না।

তৃষা ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো কাগজ বের করল।

—"এটা অর্ণবের জিনিস ছিল। অনেক বছর পর পেয়েছি।"

মায়া কাগজটার দিকে তাকাল।

তার হাত কাঁপতে লাগল।

সে কাগজটা নিল না।

—"আমি এসব আর চাই না।"

তৃষা বলল,

—"কিন্তু তোর স্বামীকে সত্যিটা বলা উচিত।"

মায়া মাথা তুলল।

—"আমি জানি।"

—"তাহলে বল।"

—"আমি ভয় পাই।"

তৃষা তার হাত ধরল।

—"এবার তোকে একা ভয় পেতে হবে না।"

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মায়া দেখল, আরিয়ান ড্রয়িংরুমে বসে আছে।

তার সামনে একটা ফাইল।

মায়া থেমে গেল।

—"কী হয়েছে?"

আরিয়ান ধীরে বলল,

—"আজ তোমার সঙ্গে তৃষার দেখা হয়েছে?"

মায়ার মুখ সাদা হয়ে গেল।

—"আপনি জানলেন কীভাবে?"

আরিয়ান বলল,

—"আমি তোমাকে অনুসরণ করিনি। তৃষা নিজেই আমাকে ফোন করেছিল।"

মায়া চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

আরিয়ান ফাইলটা বন্ধ করে বলল,

—"সে শুধু বলেছে, তোমার অতীত সম্পর্কে তোমার সঙ্গে তার কথা হয়েছে।"

মায়ার চোখে পানি এসে গেল।

—"আমি বলতে চেয়েছিলাম।"

—"তাহলে বলো।"

মায়া বসে পড়ল।

তার হাত কাঁপছে।

—"আমি যখন পনেরো বছরের ছিলাম..."

এরপর সে ধীরে ধীরে সব বলতে শুরু করল।

কীভাবে অর্ণব তাকে বিশ্বাস করেছিল।

কীভাবে তৃষার বাড়িতে গিয়ে সে বিপদের মধ্যে পড়েছিল।

কীভাবে অর্ণব তাকে ভয় দেখিয়েছিল।

কীভাবে সে কাউকে কিছু বলতে পারেনি।

কীভাবে সে বছরের পর বছর নিজেকে দোষী ভেবেছে।

কীভাবে অর্ণব অন্য মেয়ের সঙ্গে চলে গিয়েছিল।

সব।

একটা কথাও সে লুকাল না।

বলতে বলতে মায়ার গলা ভেঙে গেল।

শেষে সে মাথা নিচু করে বলল,

—"আমি জানি, আপনি এখন আমাকে অন্য চোখে দেখবেন।"

আরিয়ান স্থির হয়ে বসে ছিল।

মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—"আমি চাইনি আপনি আমাকে এমন অবস্থায় জানুন।"

আরিয়ান উঠে দাঁড়াল।

মায়া ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল।

তার মনে হলো—

এবার হয়তো আরিয়ানও চলে যাবে।

কিন্তু আরিয়ান তার সামনে এসে থামল।

তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,

—"তুমি কি সত্যিই এত বছর ধরে ভাবছ, ওই ঘটনার জন্য তুমি দায়ী?"

মায়া কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ল।

আরিয়ান চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল।

তারপর বলল,

—"তুমি তখন একটা শিশু ছিলে, মায়া।"

মায়ার চোখ থেকে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।

আরিয়ান বলল,

—"তোমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছিল।"

সে একটু থেমে বলল,

—"তুমি কোনো ভুল করোনি।"

মায়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

সে আরিয়ানের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগল।

আরিয়ান তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

—"এত বছর একা একা কষ্ট পেয়েছ কেন?"

মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—"ভয় পেয়েছিলাম..."

—"আমাকে কেন ভয় পেলে?"

—"যদি আপনিও আমাকে ছেড়ে দেন?"

আরিয়ানের বুক কেঁপে উঠল।

সে মায়ার মাথায় হাত রেখে বলল,

—"আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।"

সেই রাতে অনেক বছর পর মায়া নিজের অতীতের কথা কাউকে বলে হালকা হলো।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।

কারণ আরিয়ান মায়াকে ক্ষমা বা দয়া করেনি।

সে শুধু বুঝেছিল—

মায়ার কোনো ক্ষমা পাওয়ার প্রয়োজনই নেই।

তার প্রয়োজন ছিল এমন একজন মানুষ, যে তাকে তার অতীত দিয়ে বিচার করবে না।

কিন্তু পরদিন অফিসে নতুন একটা সমস্যা তৈরি হলো।

অর্ণব আবার শহরে ফিরেছে।

আর শুধু ফিরেই থামেনি—

সে আরিয়ানের কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে।

আরিয়ান খবরটা জানতে পেরে অবাক হয়ে গেল।

মায়া যখন নামটা শুনল, তার মুখের রং বদলে গেল।

আরিয়ান তার হাত ধরল।

—"তুমি ভয় পেয়ো না।"

মায়া কাঁপা গলায় বলল,

—"ও আবার আমার জীবনে কেন ফিরছে?"

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—"যতক্ষণ আমি আছি, ও তোমার জীবনে কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।"

কিন্তু মায়ার মনে তখন একটাই ভয়—

অর্ণব যদি অতীতের কোনো প্রমাণ সামনে আনে?

আরিয়ান কি তখনও একইভাবে তার পাশে থাকবে?

অর্ণবের নামটা শোনার পর থেকেই মায়ার ভেতরটা অস্থির হয়ে ছিল।

বছরের পর বছর সে মানুষটার কথা মনে করতে চায়নি।

ভুলে যেতে চেয়েছিল।

নিজেকে বোঝাতে চেয়েছিল—

অতীত শেষ।

কিন্তু কিছু মানুষ অতীত হয়ে গেলেও তাদের রেখে যাওয়া ভয়টা থেকে যায়।

অর্ণব আবার ফিরে এসেছে।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়—

সে এখন মায়ার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছে।

আরিয়ান।

মায়া জানত, অর্ণবের সঙ্গে আরিয়ানের দেখা হলে পরিস্থিতি ভালো হবে না।

কারণ আরিয়ান রাগী।

অন্যায়ের ব্যাপারে তার রাগ আরও ভয়ংকর।

পরদিন সকালে আরিয়ান অফিসে যাওয়ার আগে মায়াকে বলল,

—"আজ তুমি বাড়িতেই থাকো।"

মায়া অবাক।

—"কেন?"

—"কিছু মিটিং আছে।"

—"আমিও অফিসে যাব।"

—"না।"

মায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,

—"আপনি আমাকে অফিসে যেতে দিচ্ছেন না?"

—"আমি তোমাকে নিরাপদ রাখতে চাই।"

—"আমি এত দুর্বল না।"

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলল,

—"আমি জানি তুমি দুর্বল নও। কিন্তু তোমার ভয়গুলোকে আমি ছোট করে দেখতে চাই না।"

মায়া চুপ করে গেল।

তারপর বলল,

—"আপনি কি আমার জন্য চিন্তা করছেন?"

আরিয়ান মৃদু হাসল।

—"প্রতিদিন।"

মায়ার চোখ নরম হয়ে গেল।

সে বলল,

—"তাহলে সাবধানে যাবেন।"

—"তুমিও।"

আরিয়ান বেরিয়ে গেল।

কিন্তু দুপুরের দিকে মায়া একটা ফোন পেল।

অচেনা নম্বর।

সে ধরতেই ওপাশ থেকে অর্ণবের গলা।

মায়ার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

—"মায়া?"

সে কোনো উত্তর দিল না।

অর্ণব বলল,

—"অনেক বছর হয়ে গেল।"

মায়া কাঁপা গলায় বলল,

—"আমাকে ফোন করো না।"

—"আমি শুধু কথা বলতে চেয়েছি।"

—"আমার সঙ্গে তোমার কোনো কথা নেই।"

অর্ণব একটু হেসে বলল,

—"তোর স্বামীকে সব বলেছিস?"

মায়া চুপ।

—"তাহলে নিশ্চয়ই এখন আমাকে ঘৃণা করে।"

মায়া এবার দৃঢ় গলায় বলল,

—"তুমি আমার জীবন থেকে বেরিয়ে গেছ অনেক আগেই। আর ফিরে আসতে পারবে না।"

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর অর্ণব বলল,

—"দেখা হবে।"

ফোন কেটে গেল।

মায়ার হাত থেকে ফোন পড়ে গেল।

সে কাঁপতে কাঁপতে সোফায় বসে পড়ল।

সন্ধ্যায় আরিয়ান বাড়ি ফিরে দেখল, মায়া দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

তার মুখ দেখে আরিয়ান বুঝল কিছু হয়েছে।

—"কী হয়েছে?"

মায়া কিছু বলল না।

আরিয়ান কাছে এসে বলল,

—"মায়া?"

সে হঠাৎ আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরল।

আরিয়ান অবাক হয়ে গেল।

তারপর ধীরে ধীরে মায়ার মাথায় হাত রাখল।

—"কী হয়েছে?"

মায়া কাঁপা গলায় বলল,

—"ও ফোন করেছিল।"

আরিয়ানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

—"অর্ণব?"

মায়া মাথা নাড়ল।

আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—"ও কী বলেছে?"

মায়া সব বলল।

আরিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

সে ফোনটা হাতে নিয়ে কিছু করতে যাচ্ছিল।

মায়া তার হাত ধরে বলল,

—"না।"

—"কেন?"

—"আমি চাই না আপনি ওর সঙ্গে ঝামেলায় জড়ান।"

—"সে তোমাকে ভয় দেখিয়েছে।"

—"আমি চাই না আপনার কোনো সমস্যা হোক।"

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—"তুমি আমার স্ত্রী। তোমার সমস্যা মানেই আমার সমস্যা।"

মায়ার চোখে পানি চলে এল।

—"আপনি আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করেন কেন?"

আরিয়ান মৃদু গলায় বলল,

—"কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি।"

মায়া থমকে গেল।

যদিও সে জানত।

তবুও মুখে শুনে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

পরদিন অর্ণব আরিয়ানের অফিসে হাজির হলো।

রিসেপশন থেকে খবর যেতেই আরিয়ান বুঝে গেল কে এসেছে।

সে নিজেই বলল,

—"ভেতরে পাঠান।"

অর্ণব কেবিনে ঢুকল।

দুজন কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।

অর্ণব বলল,

—"আপনি নিশ্চয়ই আমার সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছেন।"

আরিয়ান ঠান্ডা গলায় বলল,

—"যতটুকু জানার দরকার, জেনেছি।"

অর্ণব হাসল।

—"মায়া সবটা বলেছে?"

আরিয়ানের চোখ কঠিন হয়ে গেল।

—"তার নাম আপনার মুখে নেবেন না।"

অর্ণব চেয়ার টেনে বসতে গেল।

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—"বসার অনুমতি আপনাকে দিইনি।"

অর্ণব থেমে গেল।

আরিয়ান বলল,

—"আপনি এখানে কেন?"

—"পুরোনো কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলতে।"

—"আপনার সঙ্গে মায়ার কোনো বিষয় নেই।"

অর্ণব হেসে বলল,

—"আপনি কি জানেন, ও তখন আমাকে ভালোবাসত?"

আরিয়ানের চোখে রাগ দেখা দিল।

কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।

—"সে তখন শিশু ছিল।"

অর্ণব বলল,

—"কিন্তু সম্পর্ক তো ছিল।"

আরিয়ান ধীরে উঠে দাঁড়াল।

—"আপনি যা করেছিলেন, তার কোনো অজুহাত নেই।"

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—"আপনি কি নিশ্চিত, মায়া আপনাকে সব বলেছে?"

এই কথাটা আরিয়ানের মনে একটা সন্দেহের ছায়া ফেলল।

অর্ণব বেরিয়ে গেল।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আরিয়ান কিছুটা অস্বাভাবিক ছিল।

মায়া বুঝতে পারল।

—"কী হয়েছে?"

—"কিছু না।"

মায়ার বুক কেঁপে উঠল।

এই একই কথা তো সে এতদিন বলেছে।

এখন আরিয়ান বলছে।

—"আপনি আমার ওপর রাগ করেছেন?"

—"না।"

—"তাহলে এমন চুপ কেন?"

আরিয়ান চুপ করে রইল।

মায়া ধীরে বলল,

—"ও আপনার সঙ্গে দেখা করেছে?"

আরিয়ান তাকাল।

—"হ্যাঁ।"

মায়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—"ও কী বলেছে?"

—"কিছু কথা।"

—"আপনি কি ওর কথা বিশ্বাস করেছেন?"

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—"না।"

কিন্তু মায়ার মনে সন্দেহ ঢুকে গেল।

সে বলল,

—"আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন?"

—"না।"

—"তাহলে?"

আরিয়ান কিছু বলতে পারল না।

মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—"আপনি যদি আমাকে বিশ্বাস না করেন, তাহলে আগে থেকেই বলুন।"

—"মায়া, আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।"

—"তাহলে আপনার চোখে এত প্রশ্ন কেন?"

আরিয়ান চুপ।

মায়া ঘুরে চলে গেল।

সেদিন রাতে দুজন একই ঘরে থেকেও কথা বলল না।

পরদিন সকালে মায়া অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল।

আরিয়ান বলল,

—"আজ যেও না।"

মায়া ঠান্ডা গলায় বলল,

—"কেন?"

—"আমি চাই না তুমি অর্ণবের কোনো ঝামেলায় পড়ো।"

—"আপনি কি আমাকে আটকে রাখতে চান?"

—"না।"

—"তাহলে আমাকে নিজের মতো থাকতে দিন।"

আরিয়ান এবার একটু রেগে বলল,

—"তুমি বুঝতে চাইছ না!"

মায়াও কেঁদে ফেলল।

—"আমি সবসময়ই বুঝতে চেষ্টা করি। কিন্তু আপনি আমার সঙ্গে কথা না বলে সিদ্ধান্ত নেন।"

আরিয়ান চুপ হয়ে গেল।

মায়া ব্যাগ তুলে বেরিয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে আরিয়ানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

অফিসে গিয়ে মায়া জানতে পারল, তার নামে একটা অভিযোগ এসেছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সে নাকি কোম্পানির কিছু গোপন তথ্য বাইরে দিয়েছে।

মায়া হতবাক।

সে কিছুই করেনি।

কিন্তু প্রমাণ হিসেবে তার অফিস আইডি দিয়ে পাঠানো কিছু ইমেইল দেখানো হলো।

মায়া বুঝল—

এটা অর্ণবের কাজ হতে পারে।

সে সঙ্গে সঙ্গে আরিয়ানকে ফোন করল।

ফোন ধরল না।

আবার করল।

ধরল না।

মায়ার চোখে পানি চলে এল।

তার মনে হলো—

আরিয়ানও কি এবার তাকে বিশ্বাস করবে না?

সন্ধ্যায় সে বাড়ি ফিরল না।

একটা ছোট ব্যাগ নিয়ে মায়ের বাড়ির দিকে চলে গেল।

আরিয়ান রাতে বাড়ি ফিরে ঘর খালি পেল।

টেবিলের ওপর শুধু একটা চিঠি।

সে কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলল।

তাতে লেখা—

"আমি জানি না আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন কি না। কিন্তু আমি আর আপনার জীবনে বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। কিছুদিন দূরে থাকছি। আমাকে খুঁজবেন না।"

চিঠিটা পড়ার পর আরিয়ান অনেকক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ধীরে চোখ বন্ধ করল।

তার মুখে রাগ নয়—

ভয়।

মায়াকে হারানোর ভয়।

সে নিজের মনে বলল,

—"তুমি ভুল করেছ, মায়া।"

তারপর ফোন তুলে কাউকে কল করল।

—"ওর নামে যে অভিযোগ এসেছে, তার পুরো তদন্ত এখনই শুরু করুন।"

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—"আর অর্ণবের ব্যাপারে যা যা তথ্য পাওয়া যায়, সব আমার দরকার।"

তার চোখে এবার কঠিন দৃঢ়তা।

মায়া দূরে চলে গেছে।

কিন্তু আরিয়ান তাকে ফিরিয়ে আনবে।

শুধু ভালোবাসা দিয়ে নয়—

সত্যিটা প্রমাণ করেও।


মায়া মায়ের বাড়িতে ফিরে আসার পর তিন দিন কেটে গেছে।

তিন দিন।

কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছিল, যেন তিন বছর।

সে কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলছে না।

মা বারবার জিজ্ঞেস করছেন,

—"আরিয়ানের সঙ্গে কী হয়েছে?"

মায়া শুধু বলছে,

—"কিছু না।"

কিন্তু তার চোখের নিচের কালো দাগ বলে দিচ্ছিল, সবকিছু ঠিক নেই।

রাতে ঘুমাতে গেলেই আরিয়ানের কথা মনে পড়ে।

তার রাগ।

তার হাসি।

সকালে চা বানিয়ে দেওয়া।

বৃষ্টিতে ছাতা ধরে দাঁড়ানো।

আর সেই কথাটা—

"আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।"

মায়া চোখ বন্ধ করল।

তারপর নিজেকেই বলল,

—"তাহলে আমাকে যেতে দিলে কেন?"

কথাটা বলেই তার চোখ ভিজে গেল।

অন্যদিকে আরিয়ানও শান্তিতে নেই।

সে গত তিন দিন অফিসের কাজের পাশাপাশি মায়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করছে।

কোম্পানির আইটি টিম রিপোর্ট পরীক্ষা করল।

ইমেইলগুলো মায়ার অফিস আইডি থেকে পাঠানো হলেও লগে দেখা গেল—

যে সময়ে মেইলগুলো পাঠানো হয়েছে, মায়া তখন অফিসেই ছিল না।

আরও তদন্ত করে জানা গেল, তার আইডির পাসওয়ার্ড বাইরে থেকে ব্যবহার করা হয়েছিল।

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—"কোথা থেকে?"

আইটি প্রধান বলল,

—"একটা বাইরের ডিভাইস থেকে। লোকেশন ট্রেস করা হচ্ছে।"

আরিয়ান ঠান্ডা গলায় বলল,

—"যে করেছে, তাকে খুঁজে বের করুন।"

কয়েক ঘণ্টা পর রিপোর্ট এল।

একটা পুরোনো নম্বর।

অর্ণবের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এমন একজনের নাম।

আরিয়ান চোখ বন্ধ করল।

সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল।

অর্ণব শুধু মায়াকে ভয় দেখাতে আসেনি।

সে ইচ্ছে করেই তাদের সংসারে ফাটল ধরাতে চেয়েছে।

রাতে আরিয়ান মায়াকে ফোন করল।

মায়া ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

কল কেটে গেল।

আবার এল।

সে এবারও ধরল না।

তৃতীয়বার ফোন আসতেই মা বললেন,

—"ধরো।"

মায়া মাথা নাড়ল।

—"আমি পারব না।"

—"কেন?"

—"ওর গলা শুনলেই আমি দুর্বল হয়ে যাই।"

মা মৃদু গলায় বললেন,

—"দুর্বল হওয়া আর কাউকে ভালোবাসা এক জিনিস না।"

মায়া চুপ করে রইল।

তারপর ফোনটা হাতে নিল।

কল তখন কেটে গেছে।

কিছুক্ষণ পর একটা মেসেজ এল।

"আমি তোমাকে কোনো ব্যাখ্যা দিতে ফোন করিনি। শুধু বলতে চেয়েছি—আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।"

মায়ার চোখ ভিজে উঠল।

সে মেসেজটা অনেকক্ষণ ধরে দেখল।

কিন্তু উত্তর দিল না।

পরদিন আরিয়ান নিজেই মায়ার মায়ের বাড়িতে গেল।

মায়া তাকে দরজা থেকে দেখেই থমকে গেল।

আরিয়ান খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।

চোখে ঘুম নেই।

দাড়ি একটু বড় হয়ে গেছে।

মায়া বুঝতে পারল, সে ঠিকমতো ঘুমায়নি।

আরিয়ান মায়ার মায়ের সঙ্গে কথা বলে বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।

মায়া কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এল।

দুজনের মধ্যে কয়েক হাত দূরত্ব।

কেউ কথা বলছে না।

শেষ পর্যন্ত আরিয়ান বলল,

—"আমি ভেতরে আসতে পারি?"

মায়া ঠান্ডা গলায় বলল,

—"কেন?"

—"তোমার সঙ্গে কথা বলতে।"

—"কী কথা?"

আরিয়ান একটা ফাইল এগিয়ে দিল।

—"তোমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এসেছিল, সেটা মিথ্যা।"

মায়া ফাইলটা নিল না।

—"আমি জানতাম আমি কিছু করিনি।"

—"আমি জানি।"

মায়া তাকাল।

—"তাহলে আমাকে বিশ্বাস করতে এত সময় লাগল কেন?"

আরিয়ান চুপ করে গেল।

এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই।

সে ধীরে বলল,

—"আমি তোমাকে অবিশ্বাস করিনি।"

—"তাহলে?"

—"আমি ভয় পেয়েছিলাম।"

মায়া অবাক।

—"আপনি?"

—"হ্যাঁ।"

আরিয়ান চোখ নামিয়ে বলল,

—"তোমাকে হারানোর ভয়।"

মায়ার চোখে পানি চলে এল।

কিন্তু অভিমান এখনও যায়নি।

—"তবুও আপনি আমাকে একা যেতে দিলেন।"

আরিয়ান বলল,

—"তুমি নিজেই চলে গিয়েছিলে।"

—"আপনি আমাকে থামাননি।"

আরিয়ান এবার তার চোখের দিকে তাকাল।

—"কারণ আমি জানতাম, তখন তোমাকে জোর করলে তুমি আরও ভয় পাবে।"

মায়ার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল।

আরিয়ান বলল,

—"তোমার জীবনে অনেক মানুষ তোমার সিদ্ধান্তের ওপর জোর করেছে। আমি তাদের মতো হতে চাইনি।"

মায়া আর কিছু বলতে পারল না।

আরিয়ান চলে যাওয়ার আগে বলল,

—"আমি তোমাকে নিতে আসিনি।"

মায়া অবাক।

—"তাহলে?"

—"তোমাকে জানাতে এসেছি, তোমার জায়গাটা এখনও আমার পাশে।"

মায়ার ঠোঁট কেঁপে উঠল।

আরিয়ান ফিরে যেতে লাগল।

মায়া পেছন থেকে বলল,

—"আরিয়ান।"

সে থামল।

মায়া কিছু বলতে পারল না।

আরিয়ান ফিরে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—"যেদিন মন চাইবে, সেদিন এসো।"

তারপর চলে গেল।

মায়া দরজায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তার চলে যাওয়া দেখল।

সেই রাতে মায়া আর ঘুমাতে পারল না।

তার মনে হচ্ছিল, সে ভুল করেছে।

কিন্তু অভিমানও তাকে ছাড়ছে না।

ভোরের দিকে সে উঠে আরিয়ানের দেওয়া পুরোনো ছাতাটা বের করল।

ছাতাটা খুলে তাকিয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ বুঝতে পারল—

সে ছাতাটা এতদিন ধরে কেন রেখে দিয়েছে।

কারণ ছাতাটা শুধু একটা ছাতা ছিল না।

এটা ছিল সেই প্রথম দিনের স্মৃতি, যখন কেউ তাকে বৃষ্টির মধ্যে নিজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল।

মায়ার চোখে পানি এসে গেল।

সে ফোন হাতে নিল।

আরিয়ানের নামের ওপর আঙুল রাখল।

কল করবে?

কিছুক্ষণ দ্বিধা করে আবার ফোন রেখে দিল।

—"না। আগে ও আসুক।"

নিজের কথাতেই মায়া হেসে ফেলল।

সে এখনও অভিমানী।

অন্যদিকে আরিয়ানও চুপ করে বসে ছিল।

তার হাতে মায়ার একটা ছবি।

ছবিটা দেখে সে মৃদু হাসল।

ঠিক তখন তার ফোনে খবর এল—

অর্ণবকে পুলিশি তদন্তের জন্য আটক করা হয়েছে।

অর্ণবের বিরুদ্ধে আগের ঘটনাগুলোর পাশাপাশি মায়ার নামে মিথ্যা অভিযোগ তৈরির প্রমাণও পাওয়া গেছে।

আরিয়ান ফোনটা নামিয়ে রাখল।

তার মনে হলো, একটা অধ্যায় শেষ হলো।

কিন্তু তার নিজের গল্প এখনও শেষ হয়নি।

কারণ মায়া এখনও তার কাছে নেই।

কয়েকদিন পর মায়া নিজেই অফিসে গেল।

আরিয়ান তখন কনফারেন্স রুমে।

মায়া তার কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

দরজা খুলতেই দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড কিছু বলল না।

তারপর ধীরে বলল,

—"এসেছ?"

মায়া মাথা নাড়ল।

—"হ্যাঁ।"

—"কেন?"

মায়া একটু হাসল।

—"আপনি বলেছিলেন, যেদিন মন চাইবে সেদিন আসতে।"

আরিয়ানের চোখে অদ্ভুত একটা আলো ফুটে উঠল।

কিন্তু সে এগিয়ে গেল না।

শুধু বলল,

—"তাহলে বসো।"

মায়া বসে পড়ল।

কিছুক্ষণ দুজন চুপ করে থাকল।

তারপর মায়া বলল,

—"আমি একটা কথা বলতে এসেছি।"

—"বল।"

—"আমি আপনার ওপর খুব রাগ করেছিলাম।"

—"জানি।"

—"অনেক অভিমানও করেছি।"

—"সেটাও জানি।"

—"কিন্তু..."

মায়া থেমে গেল।

আরিয়ান অপেক্ষা করল।

মায়া ধীরে বলল,

—"আপনাকে ছাড়া থাকতে পারিনি।"

আরিয়ানের চোখ নরম হয়ে গেল।

সে উঠে দাঁড়িয়ে মায়ার সামনে এসে বলল,

—"আমি কিন্তু বলিনি যে তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব।"

মায়া চোখের পানি মুছে হাসল।

—"তাহলে?"

আরিয়ান হাত বাড়িয়ে দিল।

—"চলো, বাড়ি যাই।"

মায়া তার হাতের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নিজের হাতটা ধীরে ধীরে আরিয়ানের হাতে রাখল।

আরিয়ান তার হাতটা শক্ত করে ধরল না।

শুধু ধরে রাখল।

যেন বলছে—

এবারও তুমি চাইলে ছেড়ে দিতে পারো।

কিন্তু মায়া হাত সরাল না।

বরং আস্তে করে বলল,

—"এইবার কিন্তু আমাকে আর একা ছেড়ে দেবেন না।"

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—"এইবার তুমি নিজেই হাত ছাড়বে না।"

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।

তাদের পেছনে পড়ে রইল দীর্ঘ কয়েক দিনের অভিমান।

কিন্তু সামনে অপেক্ষা করছিল নতুন একটা সকাল।

আর সেই সকালের গল্পটাই হবে তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।


বাড়িতে ফেরার পর প্রথম কয়েকটা দিন মায়ার কাছে অদ্ভুত ছিল।

সবকিছু আগের মতো।

ডাইনিং টেবিলে দুটো চেয়ার।

সোফার পাশে আরিয়ানের বই।

বারান্দায় রাখা মায়ার গাছগুলো।

আর শোবার ঘরের সেই পরিচিত পরিবেশ।

শুধু একটা জিনিস বদলে গিয়েছিল—

মায়া এবার আর নিজের ভেতরে সবকিছু লুকিয়ে রাখছিল না।

আরিয়ানও তাকে কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি করছিল না।

সে শুধু পাশে থাকছিল।

যেন মায়াকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল—

ফিরে আসাটা যথেষ্ট।

সকালে মায়া ঘুম থেকে উঠে দেখল, আরিয়ান বিছানার পাশে বসে ফোন দেখছে।

মায়া চোখ কচলে বলল,

—"আপনি এত সকালে উঠেছেন?"

আরিয়ান তাকিয়ে মুচকি হাসল।

—"তুমি ঘুমাচ্ছিলে।"

—"তাহলে ডাকেননি কেন?"

—"তোমার ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছে করেনি।"

মায়া একটু চুপ করে থেকে বলল,

—"আপনি এখনও আমার ওপর রাগ করে আছেন?"

আরিয়ান অবাক হয়ে বলল,

—"কেন?"

—"আমি আপনাকে না বলে চলে গিয়েছিলাম।"

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—"রাগ হয়েছিল।"

মায়ার মুখটা মলিন হয়ে গেল।

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরে বলল,

—"কিন্তু তার চেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিলাম।"

—"কিসের?"

—"তুমি যদি আর ফিরে না আসো।"

মায়ার চোখ ভিজে উঠল।

সে আস্তে বলল,

—"আমি আর যাব না।"

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—"প্রতিশ্রুতি?"

মায়া মৃদু হেসে বলল,

—"প্রতিশ্রুতি।"

সেদিন দুপুরে মায়া রান্নাঘরে ছিল।

আরিয়ান অফিসে যাওয়ার আগে বলেছিল, রাতে একটু দেরি হবে।

কিন্তু সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার মধ্যেই দরজা খুলে সে বাড়ি ঢুকল।

মায়া অবাক হয়ে বলল,

—"আজ এত তাড়াতাড়ি?"

আরিয়ান জুতো খুলতে খুলতে বলল,

—"তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল।"

মায়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল।

—"অফিসে এত কাজের মাঝেও এসব মনে থাকে?"

—"সবচেয়ে বেশি এগুলোই মনে থাকে।"

মায়া রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

আরিয়ান পেছন পেছন গিয়ে বলল,

—"কী রান্না হচ্ছে?"

—"আপনার পছন্দের।"

—"সত্যি?"

—"হ্যাঁ।"

আরিয়ান মজা করে বলল,

—"তাহলে আজ তোমাকে একটা পুরস্কার দিতে হবে।"

মায়া ঘুরে তাকাল।

—"কী পুরস্কার?"

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—"সেটা পরে বলব।"

মায়া লজ্জা পেয়ে বলল,

—"আপনি একদম বদলে গেছেন।"

—"তোমার জন্য।"

রাতে খাওয়ার পর দুজন বারান্দায় বসেছিল।

আকাশে চাঁদ।

হালকা বাতাস।

মায়া চুপচাপ ছিল।

আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—"কী ভাবছ?"

—"ভাবছি, জীবন কত অদ্ভুত।"

—"কেন?"

মায়া ধীরে বলল,

—"একসময় মনে হয়েছিল, আমি কোনোদিন সুখী হতে পারব না।"

আরিয়ান চুপ করে শুনছিল।

—"মনে হতো, আমার জীবনে যা হয়েছে তার পর কেউ আমাকে সত্যি করে গ্রহণ করবে না।"

আরিয়ান তার হাত ধরল।

—"কিন্তু?"

মায়া তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

—"কিন্তু একজন মানুষ এসে সব ভুল প্রমাণ করে দিল।"

আরিয়ান হেসে বলল,

—"লোকটা কে?"

মায়া ভান করে ভাবল।

—"মনে পড়ছে না।"

আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,

—"তাহলে আমাকে খুঁজে বের করতে হবে।"

মায়া হেসে তার কাঁধে মাথা রাখল।

—"আপনিই।"

আরিয়ান তার মাথায় হাত রাখল।

দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

এই নীরবতাটা অস্বস্তিকর ছিল না।

বরং শান্ত।

মায়া মনে মনে ভাবল—

এই মানুষটার পাশে থাকলে নীরবতাও নিরাপদ লাগে।

কিন্তু তাদের জীবনে এখনও একটা ছোট্ট সমস্যা ছিল।

আরিয়ানের রাগ।

সে এখনও খুব রাগী।

একদিন মায়া অফিস থেকে একটু দেরি করে বাড়ি ফিরল।

আরিয়ান বারবার ফোন করেছিল।

মায়া একটা মিটিংয়ে থাকায় ফোন ধরতে পারেনি।

বাড়ি ফিরতেই আরিয়ান গম্ভীর গলায় বলল,

—"ফোন ধরনি কেন?"

মায়া ব্যাগ নামিয়ে বলল,

—"মিটিংয়ে ছিলাম।"

—"একটা মেসেজ করতে পারতে।"

—"আমি ভুলে গিয়েছিলাম।"

আরিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,

—"তুমি সবসময় এমন করো।"

মায়ারও মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।

—"আপনি আবার শুরু করেছেন?"

—"আমি চিন্তা করি, সেটা বুঝতে পারো না?"

—"চিন্তা আর রাগ দেখানো এক জিনিস না।"

আরিয়ান চুপ করে গেল।

মায়া ঘরে চলে গেল।

দশ মিনিট পর দরজায় নক হলো।

মায়া দরজা খুলল না।

বাইরে থেকে আরিয়ানের গলা—

—"মায়া?"

কোনো উত্তর নেই।

—"আমি রাগ করেছিলাম।"

নীরবতা।

—"সরি।"

মায়ার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটল।

সে দরজা খুলে বলল,

—"আপনি এত তাড়াতাড়ি সরি বলেন কীভাবে?"

আরিয়ান বলল,

—"কারণ তোমার সঙ্গে বেশি সময় রাগ করে থাকতে পারি না।"

মায়া বলল,

—"আর আমি পারি।"

—"মিথ্যা।"

—"সত্যি।"

—"তাহলে তিন মিনিট আগে দরজা খুললে কেন?"

মায়া চোখ বড় করে বলল,

—"আপনি খুব বিরক্তিকর!"

আরিয়ান হেসে ফেলল।

মায়াও হাসল।

অভিমান আবার মিলিয়ে গেল।

কয়েকদিন পর আরিয়ান মায়াকে নিয়ে সেই জায়গায় গেল, যেখানে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল—অফিসের পুরোনো ভবনটি।

মায়া অবাক হয়ে বলল,

—"এখানে কেন?"

আরিয়ান বলল,

—"একটা স্মৃতি মনে করাতে।"

—"কোনটা?"

—"যেদিন প্রথম তোমাকে দেখেছিলাম, তুমি আমাকে খুব ভয় পেয়েছিলে।"

মায়া হেসে বলল,

—"আপনি তখন ভীষণ রাগী ছিলেন।"

—"এখন?"

—"এখনও।"

—"কিন্তু?"

মায়া একটু কাছে এসে বলল,

—"এখন আর ভয় পাই না।"

আরিয়ান তার চোখের দিকে তাকাল।

—"কখন থেকে?"

মায়া কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

—"যেদিন বুঝেছিলাম, আপনার রাগ আমার বিরুদ্ধে না।"

আরিয়ান মৃদু হাসল।

—"আর ভালোবাসা?"

মায়া লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে বলল,

—"ওটা বুঝতে একটু সময় লেগেছিল।"

—"কতটা?"

—"অনেকটা।"

—"এখন বুঝেছ?"

মায়া মাথা তুলে বলল,

—"হ্যাঁ।"

আরিয়ান ধীরে তার হাত ধরল।

—"তাহলে একটা কথা বলো।"

—"কী?"

—"আমাকে ভালোবাসো?"

মায়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

—"অনেক।"

আরিয়ানের মুখে সেই বিরল হাসিটা ফুটে উঠল।

—"আবার বলো।"

মায়া হেসে বলল,

—"না।"

—"কেন?"

—"একবার বলেছি।"

—"আমি তো শুনিনি।"

—"মিথ্যা।"

—"তবুও আবার বলো।"

মায়া এবার তার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,

—"আমি তোমাকে ভালোবাসি, আরিয়ান।"

আরিয়ান কিছু বলল না।

শুধু তার হাতটা নিজের বুকের কাছে এনে রাখল।

—"এবার শুনেছি।"

মায়ার চোখ ভিজে উঠল।

রাতে বাড়ি ফেরার পথে মায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

তার মনে হলো—

সে আর সেই পনেরো বছরের ভীত মেয়েটা নেই।

অতীত তাকে কষ্ট দিয়েছে।

কিন্তু সেই কষ্ট তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারেনি।

কারণ সে এমন একজন মানুষকে পেয়েছে, যে তাকে তার অতীত দিয়ে বিচার করেনি।

বরং তাকে নতুন করে নিজের জীবনকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে।

আরিয়ান গাড়ি চালাতে চালাতে বলল,

—"কী ভাবছ?"

মায়া হেসে বলল,

—"ভাবছি, আপনাকে একটা কথা বলা হয়নি।"

—"কী?"

—"আপনি যখন প্রথম আমাকে বলেছিলেন, 'আমি আছি'—সেদিন থেকেই হয়তো আমার ভেতরে বিশ্বাস জন্মেছিল।"

আরিয়ান তার দিকে এক ঝলক তাকাল।

—"তাহলে এখনো আছি।"

মায়া মৃদু হেসে বলল,

—"জানি।"

গাড়ি এগিয়ে চলল।

সামনে নতুন রাস্তা।

নতুন জীবন।

নতুন স্বপ্ন।

কিন্তু গল্পের শেষটা এখনও বাকি।

কারণ পরের পর্বে মায়া তার জীবনের সবচেয়ে বড় একটা ইচ্ছার কথা আরিয়ানকে বলবে।

আর সেই ইচ্ছাই তাদের গল্পটাকে নিয়ে যাবে এক সুন্দর, পূর্ণাঙ্গ সমাপ্তির দিকে।

 

সকালের রোদটা সেদিন অদ্ভুত সুন্দর ছিল।

মায়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে গাছগুলোতে পানি দিচ্ছিল।

পেছন থেকে আরিয়ানের গলা ভেসে এল,

—"এত সকালে উঠেছ?"

মায়া ঘুরে তাকিয়ে হাসল।

—"আপনার জন্য চা বানাতে হবে না?"

আরিয়ান কাছে এসে বলল,

—"আজ চা আমি বানাব।"

মায়া অবাক হয়ে বলল,

—"আপনি?"

—"হ্যাঁ।"

—"নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হয়েছে।"

আরিয়ান হেসে ফেলল।

—"তোমাকে একটা কথা বলব।"

—"বলুন।"

—"আজ অফিসে যাব না।"

মায়া চোখ বড় করে বলল,

—"আপনি অসুস্থ?"

—"না।"

—"তাহলে?"

আরিয়ান তার হাত ধরে বলল,

—"আজ পুরো দিনটা তোমার সঙ্গে কাটাতে চাই।"

মায়ার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

—"কেন?"

—"কারণ অনেকদিন ধরে শুধু কাজ, ঝামেলা আর দুশ্চিন্তা করেছি। আজ শুধু তুমি আর আমি।"

মায়া কিছু বলল না।

শুধু তার হাতটা শক্ত করে ধরল।

সেদিন দুজন শহরের বাইরে একটা ছোট্ট জায়গায় গেল।

চারপাশে সবুজ।

নিরিবিলি রাস্তা।

হালকা বাতাস।

মায়া গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে তাকিয়ে বলল,

—"জায়গাটা খুব সুন্দর।"

আরিয়ান বলল,

—"তোমার ভালো লাগবে জানতাম।"

—"আপনি আগে এসেছেন?"

—"না।"

—"তাহলে?"

—"তোমাকে নিয়ে আসব বলে খুঁজে রেখেছিলাম।"

মায়া মুচকি হেসে বলল,

—"আপনি এত পরিকল্পনা করেন কখন?"

—"তোমার ব্যাপারে সবসময়।"

মায়া তার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—"আরিয়ান?"

—"হুম?"

—"আমি একটা কথা বলতে চাই।"

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।

—"বল।"

মায়া কিছুক্ষণ দ্বিধা করে বলল,

—"আমি একটা নতুন জীবন চাই।"

—"আমরা তো নতুন জীবনই শুরু করেছি।"

—"না।"

মায়া একটু থামল।

—"আমি এমন একটা জীবন চাই, যেখানে আমার অতীত আমাকে আর ভয় দেখাবে না।"

আরিয়ান তার হাত ধরল।

—"সেটা হবে।"

মায়া বলল,

—"আমি চাই, কোনো একদিন একটা ছোট্ট বাড়ি হোক আমাদের। সামনে বাগান থাকবে।"

আরিয়ান হেসে বলল,

—"আর?"

—"আপনি অফিস থেকে ফিরে আমাকে ডাকবেন। আমি রান্নাঘর থেকে ছুটে আসব।"

—"তারপর?"

মায়া লজ্জা পেয়ে বলল,

—"তারপর... আমাদের ঘরটা হাসিতে ভরে থাকবে।"

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—"আর?"

মায়া তার দিকে তাকাল।

—"হয়তো আমাদের একটা ছোট্ট বাচ্চা থাকবে।"

কথাটা বলেই মায়া লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।

আরিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হাসল।

—"তুমি সত্যিই অনেক বড় স্বপ্ন দেখো।"

মায়া মুখ ভার করে বলল,

—"তাহলে?"

আরিয়ান তার হাত ধরে বলল,

—"তাহলে সেই স্বপ্নের প্রতিটা অংশ আমি সত্যি করার চেষ্টা করব।"

মায়া হেসে ফেলল।

কয়েক মাস কেটে গেল।

তাদের সংসার আরও সুন্দর হয়ে উঠল।

আরিয়ান এখনও রাগী।

মায়া এখনও অভিমানী।

ছোটখাটো ঝগড়া হয়।

কখনো মায়া মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে।

কখনো আরিয়ান ইচ্ছে করে তাকে আরও রাগিয়ে দেয়।

তারপর নিজেই গিয়ে বলে,

—"চলো, রাগ শেষ করি।"

মায়া বলে,

—"আমি রাগ করিনি।"

আরিয়ান হাসে।

—"তাহলে কথা বলছ না কেন?"

—"ইচ্ছা করছে না।"

—"আমার সঙ্গে?"

—"হ্যাঁ।"

—"ঠিক আছে।"

আরিয়ান চলে যায়।

দুই মিনিট পর আবার ফিরে আসে।

হাতে এক কাপ চা।

—"চা খাবে?"

মায়া মুখ ঘুরিয়ে বলে,

—"না।"

—"তাহলে আমি খাব।"

মায়া চায়ের কাপটা নিয়ে নেয়।

—"দাও।"

আরিয়ান হেসে ফেলে।

—"রাগ শেষ?"

মায়া মুখ গম্ভীর করে বলে,

—"পুরোপুরি না।"

—"কতটুকু বাকি?"

—"দশ শতাংশ।"

—"ওটাও আমি শেষ করে দেব।"

মায়া হাসি চাপতে পারে না।

এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাদের সংসারকে পূর্ণ করে তুলেছিল।

একদিন রাতে মায়া পুরোনো সেই বাক্সটা বের করল।

যেটা এত বছর ধরে তার অতীতের স্মৃতি হয়ে ছিল।

সে অনেকক্ষণ বাক্সটার দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর আরিয়ানের কাছে গিয়ে বলল,

—"এগুলো আর রাখতে চাই না।"

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল না কী আছে।

শুধু বলল,

—"তুমি যা করতে স্বস্তি পাও, সেটাই করো।"

মায়া বাক্সটা বন্ধ করল।

তারপর বলল,

—"আমি আর অতীতকে ভয় পেতে চাই না।"

আরিয়ান তার পাশে এসে দাঁড়াল।

—"তাহলে আজ থেকেই অতীতকে বিদায় দাও।"

মায়া ধীরে ধীরে বাক্সটা সরিয়ে রাখল।

তার চোখে পানি ছিল।

কিন্তু এবার সেই পানি কষ্টের ছিল না।

ছিল মুক্তির।

রাতে তারা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।

আকাশে অসংখ্য তারা।

মায়া বলল,

—"আপনি জানেন, একটা সময় আমি ভাবতাম আমার জীবন শেষ।"

আরিয়ান তার দিকে তাকাল।

—"আর এখন?"

মায়া হাসল।

—"এখন মনে হয়, জীবন তখনই শুরু হয়েছিল।"

আরিয়ান মৃদু হাসল।

—"কখন?"

মায়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,

—"যেদিন আপনি আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।"

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—"না।"

মায়া অবাক।

—"না?"

—"তোমার জীবন তোমার নিজের জন্যই শুরু হয়েছিল। আমি শুধু তোমার পাশে হাঁটার সুযোগ পেয়েছি।"

মায়ার চোখ ভিজে উঠল।

সে ধীরে আরিয়ানের কাঁধে মাথা রাখল।

—"আমি ভাগ্যবান।"

আরিয়ান বলল,

—"আমিও।"

কয়েক বছর পর।

তাদের ছোট্ট বাড়ির সামনে সত্যিই একটা বাগান হয়েছে।

বারান্দায় মায়ার প্রিয় ফুল।

ড্রয়িংরুমে আরিয়ানের বই।

আর ঘরের ভেতর—

একটা শিশুর হাসির শব্দ।

মায়া ছোট্ট মেয়েটাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আরিয়ান পাশে দাঁড়িয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে,

—"তোমার মা কিন্তু খুব জেদি।"

মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—"আর তোমার বাবা ভীষণ রাগী।"

আরিয়ান হেসে বলল,

—"কিন্তু তোমার বাবা তোমার মাকে ভীষণ ভালোবাসে।"

মায়া মৃদু হেসে বলল,

—"সেটা আমি জানি।"

শিশুটাকে মাঝখানে রেখে দুজন পাশাপাশি দাঁড়াল।

মায়ার চোখ হঠাৎ আকাশের দিকে উঠল।

তার মনে পড়ল সেই ছোট্ট মেয়েটার কথা—

যে একসময় ভয় পেত।

যে কাউকে কিছু বলতে পারেনি।

যে ভাবত, তার জীবনে আর কোনোদিন সুখ আসবে না।

আজ সে জানে—

একটা খারাপ অধ্যায় কখনো পুরো বইটা নির্ধারণ করে না।

অতীতের অন্যায় তার পরিচয় নয়।

তার পরিচয়—

সে বেঁচে উঠেছে।

সে ভালোবেসেছে।

সে ভালোবাসা পেয়েছে।

আর সে নিজের জন্য একটা সুন্দর জীবন তৈরি করেছে।

আরিয়ান তার পাশে এসে দাঁড়াল।

—"কী ভাবছ?"

মায়া মৃদু হেসে বলল,

—"কিছু না।"

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—"এই 'কিছু না' কথাটা কিন্তু আমি চিনি।"

মায়া হেসে ফেলল।

—"তাহলে বলুন, কী ভাবছি?"

আরিয়ান তার হাত ধরে বলল,

—"ভাবছ, তুমি আমাকে পেয়ে ভাগ্যবান।"

মায়া মাথা নাড়িয়ে বলল,

—"ভুল।"

—"তাহলে?"

মায়া তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—"আপনি আমাকে পেয়ে ভাগ্যবান।"

আরিয়ান হেসে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল।

চারপাশে শিশুর হাসি।

বাগানে বাতাস।

আকাশে সন্ধ্যার আলো।

আর তাদের মাঝখানে—

অসংখ্য ঝড় পেরিয়ে পাওয়া শান্তি।

কারণ কিছু গল্প কষ্ট দিয়ে শুরু হলেও, শেষ পর্যন্ত তারা শেখায়—

ভালোবাসা মানে কাউকে তার অতীত দিয়ে বিচার করা নয়; বরং তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে নতুন করে বাঁচার সাহস দেওয়া।

মায়া চোখ বন্ধ করল।

আরিয়ানের হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।

এই হাতটা এবার আর ছাড়ার নয়।

 

 

....
👁 268